BdNewsEveryDay.com
Friday, October 19, 2018

দেখব ঘুরে ইরান এবার: গোলেস্তান প্রদেশ

Friday, August 10, 2018 - 838 hours ago

পুরাতত্ত্ব গবেষকদের মতে এই গোলেস্তান প্রদেশটি ইরানের মধ্যে সমৃদ্ধতম এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে স্বীকৃত। বুঝতে বাকি থাকে না যে ঐতিহাসিক এবং পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনে ভরা এই প্রদেশটি। যাই হোক আমরা ধীরে ধীরে এগুলোর সাথে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো।

বলেছিলাম যে গোলেস্তান প্রদেশে প্রাকৃতিক নিদর্শন যেমন রয়েছে তেমনি ঐতিহাসিক এবং পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনও রয়েছে প্রচুর। মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ‘তুরাঙ টিলা’, ইসলাম টিলা, রয়েছে প্রাচীন গোরগান শহর, ইস্কান্দার বাঁধ বা গোরগান প্রাচীর, কাবুস গম্বুয  এবং এরকম আরো বহু প্রাচীন স্থাপনা। প্রাচীন বলতে খ্রিষ্টপূর্ব তিন সহস্রাব্দ থেকে শুরু করে ইসলাম যুগ পর্যন্ত সময়কার বিভিন্ন স্থাপনা গোলেস্তান তার বুকে ধারণ করে অর্জন করেছে ইতিহাস ও সভ্যতার কালক্রমিক সমৃদ্ধি।

গুলেস্তান প্রদেশটি আগে মযান্দারন প্রদেশের পূর্বাঞ্চল হিসেবে পরিগণিত ছিল কিন্তু ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে এই এলাকায় বিশেষত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইরানের উন্নয়নমূলক কর্মসূচির আওতায় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আর গোরগানকে কেন্দ্রীয় শহরের মর্যাদা দিয়ে সেই থেকে শুরু হয় নতুন গুলেস্তান প্রদেশের স্বাধীন কার্যক্রম।

গুলেস্তান প্রদেশের আয়তন ২২ হাজার বর্গ কিলোমিটার। প্রদেশটির উত্তরে রয়েছে তুর্কমেনিস্তান প্রজাতন্ত্র। পূর্বদিকে ইরানের খোরাসান প্রদেশ, দক্ষিণে রয়েছে সেমনান আর পশ্চিমে রয়েছে কাস্পিয়ান সাগর এবং মযান্দারন প্রদেশ। এই প্রদেশে বিভিন্ন গোত্রের বসবাস রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে ফার্স, তুর্কমেন, সিস্তানী, বালুচ, কুর্দি, তুর্কি-গেযেলবশ তুর্কি এবং অজারবাইজানী তুর্কি এবং কাযযাকি গোত্র বা জাতির লোকজন।

এ এলাকার ফার্সরা দুই শ্রেণীর। এক শ্রেণীর ফার্স এখানকার স্থানীয় অধিবাসী। তবে আরেক শ্রেণীর ফার্সরা এখানে বাস করেন যারা এখানকার স্থানীয় অধিবাসী নয় বরং বাইরে থেকে আসা। তো স্থানীয় ফার্সরা গোরগানের স্থানীয় এবং কেতুলি ও মযান্দারনি ভাষায় কথা বলে। আর যারা বাইরে থেকে এ অঞ্চলে এসে বসবাস করেন তাঁদের বেশিরভাগই হলো সিস্তানী, সেমনানী এবং খোরাসানী। তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের ভাষায় কথা বলে। ফার্সভাষীদের বেশিরভাগ প্রদেশের কেন্দ্রিয় এবং দক্ষিণাঞ্চলে আর মযান্দারনিরা প্রদেশের পশ্চিম অঞ্চলের গ্রাম এলাকায় বসবাস করে। তুর্কমেনিরা প্রদেশের পূর্ব, মধ্য এবং উত্তরাঞ্চলে বাস করে। এরা সুন্নি মাযহাবের অনুসারী। তুর্কমেনী ভাষাতেই মূলত তারা কথা বলে। তবে ফার্সি ভাষার সাথে তাদের পরিচয় রয়েছে।

গুলেস্তান প্রদেশের সাথে বিভিন্ন এলাকার রেল যোগাযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গোরগান শহর থেকে মযান্দারনের কেন্দ্রিয় শহর  সারিতে এবং তারপর গার্মসর ও তেহরানের সাথে রেললাইন গড়ে উঠেছে। শুমোল থেকে পবিত্র মাশহাদ শহরেও চলে গেছে রেললাইন। যার ফলে গোলেস্তানে প্রচুর মুসাফিরের আনাগোণা থাকে সবসময়। স্বাভাবিকভাবেই মাশহাদে মোকাদ্দাসের যিয়ারতকারীদের সেবা করার সুযোগ হয় গোলেস্তানবাসীর।

গোলেস্তান প্রদেশ ভৌগোলিক বিশেষত্বের কারণে বিচিত্র আবহাওয়া বিরাজ করে এখানে। এই প্রদেশের পশ্চিম থেকে আলবোর্য পর্বতমালার একটি অংশ চলে গেছে পূর্বদিকে। যেতে যেতে অবশ্য পাহাড়গুলোর উচ্চতা ক্রমশ কমে গেছে। এই প্রদেশের সবোর্চ্চ পর্বতচূড়া হলো শাহভর চূড়া। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৩২০ মিটার। এই চূড়াটিই প্রদেশের সবোর্চ্চ চূড়া। গোলেস্তান প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এটি। যাই হোক এবারে চলুন সমতল ভূমিময় বিস্তৃত গুলেস্তান প্রদেশটির আবহাওয়ার সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

গোলেস্তান প্রদেশের সমতল অংশের আবহাওয়া দুই রকমের। তবে সমতল ভূমির দুই তৃতীয়াংশ এলাকাতেই বিরাজ করে শুকনো এবং প্রায় শুষ্ক আবহাওয়া। যতোই উত্তর দিকে অর্থাৎ তুর্কমেনিস্তান সীমান্তের দিকে যাওয়া যাবে ততোই আবহাওয়া শুষ্কতরো।আর বাকি এক তৃতীয়াংশের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। এই এলাকাটি পার্বত্য এবং সবুজ গাছ গাছালিতে ভরা, সেইসাথে এখানকার আবহাওয়া শুষ্ক কিংবা প্রায় শুষ্ক। কৃষিকাজের জন্যে খুবই উপযোগী এই এলাকাটি। সবুজাভ পরিবেশ এবং কৃষিকাজের উপযোগী এলাকা হবার কারণে প্রদেশের বেশিরভাগ শহর বা গ্রাম এ এলাকাতেই গড়ে উঠেছে। শীতকালে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় আবার গ্রীষ্মের সময় আবহাওয়ায় আর্দ্রতার মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

আবহাওয়াগত এই বৈচিত্র্যের কারণে এই এলাকার প্রাকৃতিক উৎসগুলো ব্যাপক সমৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এখানে রয়েছে বন-জঙ্গল, রয়েছে বিস্তীর্ণ চারণভূমি এবং সেইসাথে রয়েছে কৃষিজমির প্রাচুর্য। প্রায় ছয় লাখ হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি রয়েছে এখানে। এইসব কৃষি জমিতে যেসব ফসল উৎপন্ন হয় সেসবের মধ্যে রয়েছে গম, যব, তুলা, সূর্যমুখী, ধান , সয়া, বাদাম, শসা, লেটুসসহ আরো বিচিত্র শাকসব্জি, জয়তুন এবং অনেক ধরনের তেলবীজ জাতীয় শস্যাদি। প্রকৃতপক্ষে যেসব বীজ বা শস্যদানা থেকে তেল তৈরি হয় সমগ্র ইরানের মধ্যে সেইসব শস্যদানার প্রায় চল্লিশ শতাংশই উৎপন্ন হয় এই গোলেস্তানে। ইরানের প্রায় পঞ্চাশ ভাগ তুলা এবং তামাক উৎপন্ন হয় এই প্রদেশে।

আমরা এই প্রদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাসের দিকে সংক্ষিপ্ত নজর বুলানোর চেষ্টা করবো। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস প্রায় সাত হাজার বছরের মতো পুরনো, তার মানে সেই প্রাচীন প্রস্তরযুগে এই ভূখণ্ডটি আবাদ হয়েছিল। এখানকার সভ্যতার প্রাচীনত্বের প্রমাণ ‘গলিকেশ’ এলাকার ‘ফারাঙ’ গ্রামে অবস্থিত ‘কিয়রম’ গুহা থেকেও পাওয়া যায়। গবেষকরা সম্প্রতি কিছু নতুন নতুন তথ্য দিয়েছেন এই এলাকা সম্পর্কে। এসব তথ্য থেকে প্রমাণিত হয় গোরগান এলাকাটি ছয় হাজার বছর আগে আর্য সভ্যতারও আগের সভ্যতা নিজের মাঝে লালন করেছিল।  বেহশাহরের কাছে ‘হুতু’ নামের একটি গুহায় এইসব প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন মিলেছে।

তাছাড়া ‘তুরাঙ তাপপে’ নামের ঐতিহাসিক টিলাতেও বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ খনন কাজ করা হয়েছিল। ঐ খননকাজের ফলে এখানে উঠে এসেছে সভ্যতার প্রাচীন কিছু তথ্য। যেমন সেই প্রাচীনকালেও এখানকার গ্রামগুলো ছিল বেশ জনবহুল। তখনো মাটির বিচিত্র তৈজস ব্যবহার হতো এবং তখনো কৃষিকাজের জন্যে পানির যোগানের নানামাত্রিক প্রচেষ্টা ছিল। এই এলাকাটি নামও আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাচীন কিছু শিলালিপি থেকে। হাখামানেশীয় যুগের প্রস্তর লিখন, বিস্তুনের দারিয়ুশের প্রস্তর লিখন ইত্যাদিতে এই এলাকার নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ভারগনে’। কিন্তু পাহলভির লেখায় এসেছে ‘গোরগান’। গ্রিক ইতিহাসবিদরা এই নামটিকেই লিখেছে ‘হিরকনি’। প্রাচীন এই এলাকাটি সময় সুযোগ হলে দেখে আসতে ভুলবেন না।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/১০

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018