BdNewsEveryDay.com
Friday, October 19, 2018

সামাজিক অবক্ষয় রোধে দরকার নৈতিক শিক্ষা

Friday, August 10, 2018 - 838 hours ago

প্রতিদিন আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়ে পত্রিকার পাতা খুলতে হয়। প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন এক একটি নৈতিক অবক্ষয় নামক বুলেটের আঘাত। এ দেশের প্রিন্ট মিডিয়া, সোস্যাল মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ৫০% খবরই সামাজিক অবক্ষয়ের। কেন এই অবক্ষয়? এর প্রধান কারণ নৈতিক শিক্ষার অভাব। এখন শুধু সবার লক্ষ্য অর্থ উপার্জন। সেটা সৎ আর অসৎ যে উপায়েই হোক না কেন। সম্পর্কগুলোও যেন কমার্শিয়াল। মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান হারে বিলোপ ঘটছে। নাটক, সিনেমার মতো হয়ে উঠছে মানুষের জীবন। দুর্বৃত্তপনা, সহিংসতা, যৌনাচার, বেশ্যাপনা, মাদক আর ইন্টারনেটের নেতিবাচক ব্যবহার আচ্ছাদন করে রেখেছে গোটা সমাজটাকে। সমাজটা ছেয়ে গেছে অবক্ষয় নামক কালো বাতাসে। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার মতো নিরাপদ বাতাসের যেন বড়ই অভাব। বর্তমানে পৃথিবীর ৪৪.২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ইন্টারনেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিটিআরসির রিপোর্ট অনুযায়ী গত জুনের শেষ নাগাদ এ দেশে ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৪৭.৭৯০ মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি। কি করছে এত মানুষ ইন্টারনেটে? আমরা জানি, দেশের শিক্ষা, গবেষণা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, সরকারি, বেসরকারি ক্ষেত্রে ইন্টারনেট একটি প্রজ্বল্যমান আলোর নাম। এর ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়াগুলোও বেশ ক্রিয়াশীল। এ দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তিন কোটি ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি ১২ সেকেন্ড অন্তর একটা করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে, যেটা বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের জন্মহারের থেকেও বেশি। ফেসবুকের একটি ডাকেই শত, সহস্র জনতা অভিন্ন দাবিতে শাহবাগ, জাতীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমবেত হচ্ছে খুব স্বল্প সময়েই যেটা প্রচলিত গণমাধ্যমের দ্বারাও অসম্ভব ব্যাপার। ফেসবুকের কল্যাণেই সিলেটের রাজন হত্যার দ্রুত বিচার, বদরুল কর্তৃক খাদেজাকে জখম, তনু হত্যা এবং বনানীর রেইন্ট্রিতে তরুণী ধর্ষণের অপ্রতিরোধ্য প্রতিবাদ এ দেশের মানুষ দেখেছে। কিন্তু এর নেতিবাচক ব্যবহারও কম না বরং একটু বেশিই। ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে নানাবিধ চাকরির প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ফাঁস হচ্ছে। ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে রামুতে জাতিগত দাঙ্গা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনাও ঘটেছিল। লাইভে এসে অশালীন আচরণ এবং দেহের স্পর্শকাতর জায়গার প্রদর্শন এসব নিন্দনীয় ঘটনাও ঘটছে। ফেইক অ্যাকাউন্ট, হ্যাকিং প্রভৃতির ফলে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। অল্প বয়সেই ফেসবুক, ম্যাসেনঞ্জার ও মোবাইল ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই বিপথে পা বাড়াচ্ছে। ফেসবুকের বিশাল দুনিয়ায়, বন্ধু বান্ধবের অভাব নেই, যাদের অধিকাংশই মুখোশধারী। তারা মিথ্যাচার করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা তাদের বেশিরভাগ সময়ই ফেসবুক ব্যবহারে ব্যয় করছে। ফলে দেখা দিচ্ছে ফল বিপর্যয়। প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মানসিক অবসাদ সৃষ্টি হচ্ছে এবং নতুন নতুন মানসিক রোগের উৎপত্তি ঘটছে। হতাশার পরিমাণ বাড়ছে এবং কখনো কখনো মানুষ বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার মতো আত্মবিধ্বংসী পথ। অতিমাত্রায় প্রযুক্তির প্রতি আসক্তির ফলে মানুষ হয়ে উঠছে যান্ত্রিক। ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা হ্রাস পাচ্ছে। মানুষ হয়ে উঠছে আত্মস্বার্থলোভী এবং আত্মকেন্দ্রিক। পর্নোগ্রাফি আর একটা আতঙ্কের নাম। পর্নোগ্রাফি ইন্টারনেটে অনেক সহজলভ্য হওয়ায় এতে আসক্তির ফলে তরুণরা অশ্লীলতা, অবাধ যৌনাচার, বহুকামিতা এবং সমকামিতার মতো বিকারগ্রস্ত মানসিকতার অধিকারী হচ্ছে। ফলে শিশু ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট ঘটনাও ঘটছে এদেশে। এ দেশের দৃষ্টিনন্দন পার্কগুলোতে চলছে অশ্লীলতার খেলা, চলছে দেহব্যবসা, হয়ে উঠেছে বেহায়াপনার উত্তম উঠান। যেখানে বিপথগামী তরুণ-তরুণীরা কুরুচিপূর্ণ যৌনাচারে লিপ্ত হচ্ছে। দুর্বল পারিবারিক কাঠামোর কারণে মাদকাসক্তদের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকের করালগ্রাসে আক্রান্ত হয়ে ঐশী কর্তৃক তার বাবা-মাকে হত্যার ঘটনা কারো অজানা নয়। মাদক কেনার টাকার জন্য মাদকসেবীরা পাগলের মতো আচরণ করে। বেছে নেয় খারাপ পথের ঠিকানা, পা বাড়ায় খারাপ জগতে। যুবকরা হচ্ছে আমাদের দেশের প্রাণশক্তি, সেই প্রাণশক্তিই ক্ষয়ে যাচ্ছে মাদক নামক বিষের থাবায়। তরুণ-যুবকদের এই অধঃগতির দায় কার? এ দায় আমাদেরই। এ দায় আমাদের ত্রুটিপূর্ণ সমাজব্যবস্থারই। ছোটবেলা থেকেই নৈতিকতার বীজ তাদের অন্তরে বপন করলে আমরা পেতাম একটা সুস্থ সবল সমাজ নামক বৃক্ষ। যার নির্মল বাতাসে আর সুশীতল ছায়ায় সমাজ পেত মুক্তির স্বাদ। নৈতিক শিক্ষার প্রথম কেন্দ্র হচ্ছে পরিবার। পরিবারের সদস্যরা যদি নৈতিক হয়, শিশুরাও হয়ে উঠে নৈতিক। বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার যদি এখন থেকে নৈতিকতার বিকাশে সোচ্চার হয়, তাহলে নির্দ্বিধায় আমরা পাব একটি আদর্শ সমাজ। যেখানে অন্যায় নামক শব্দটির পাত্তা থাকবে না। অন্যায় নামক শব্দটিই হবে একটি নিখোঁজ শব্দ। আমরা শিশুদের হাতে ছোট্ট বয়সেই ফোন তুলে দেই। যেটা একটা মারাত্মক ভুল। শিশুদের সব আবদার আপনার মেটাতে হবে না। বরং তাকে লড়াই করা শেখাতে হবে, তাকে জানাতে হবে পৃথিবী কতটা নিষ্ঠুর। চাওয়ার সঙ্গে পেলেই শিশুরা মনে করবে পৃথিবীতে হয়ত সবকিছু খুব সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে এসে পরিণত বয়সে যখন সে কোনোকিছুই সহজে পায় না, তখন আশ্রয় নেয় অসৎ পথের। সন্তানদের সঠিক ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। কারণ ধর্ম হচ্ছে নৈতিক শিক্ষার পীঠস্থান। যার ভেতরে ধর্মীয় জ্ঞান থাকে সে সহজে কোন খারাপ কাজ করতে পারে না। জঙ্গিবাদ নির্মূলে এর কোনো বিকল্প নেই। লেখক: দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018