BdNewsEveryDay.com
Wednesday, December 19, 2018

শুদ্ধ মানুষের হাতে শুদ্ধাচার পুরস্কার

Friday, August 10, 2018 - 838 hours ago

  শিক্ষক গুরু। তার সম্মান অর্থে নয়, পদাধিকারই তার সম্মান এবং মর্যাদা বহন করে। পাহারা দিয়ে ভয় দেখিয়ে, আইনের নানা বেড়াজালে আবদ্ধ করে যে শিক্ষককে দিয়ে তার কর্মক্ষেত্রে কাজ করানো হয় সে আর যা হোক, শিক্ষক থেকে গুরু হয়ে উঠতে পারেন না। ১৯৯৪ সাল। গাজীপুর পিটিআইয়ে ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। বাসের প্রচ- ভিড়ের মাঝে একজন যাত্রী উঠে এলো। চোখ আটকে গেল অসাধারণ সুন্দরী এই নারীর দিকে। বারবার তাকাচ্ছিলাম; চোখ যেন ফিরাতে পারছিলাম না। তবে, যতবার তাকাচ্ছিলাম ততবারই চোখে চোখ পড়ে যাচ্ছিল। মনে মনে ভাবছিলাম এত সুন্দরী নারীটি কে? আবার ভাবছিলাম উনি বারবার আমার দিকে কেন তাকাচ্ছেন? বাস জয়দেবপুর এসে থামল। রিকশা নিয়ে আমি চলে এলাম পিটিআই-এ। গেট দিয়ে ঢোকার সময় অবাক। বাসে বারবার দেখা সুন্দরী রমণীটিও একই সময় ঢুকল গেট দিয়ে। ক্লাসে গিয়ে তো আরো অবাক। এই সুন্দরী রমণী আমার শিক্ষক। সহকারী সুপার। শুরুতেই সবাই যার যার পরিচয় দিলাম। এবার ওনার পরিচয় দেবার পালা। নাম-পদবি বলার পর সবাই একযোগে প্রশ্ন করল, আপা আপনার বর কী করে? হেসে উত্তর দিলেন, কেন? আমার পরিচয়ের জন্য আমি কি যথেষ্ট নই? আমার বরের পরিচয় ছাড়া আমি কি সম্পূর্ণ নই? আমি যদি পুরুষ হতাম তাহলে কি আমার স্ত্রীর পরিচয় জানতে চাওয়া হতো? আমি তখন জনকণ্ঠ আর ইত্তেফাকে মহিলা পাতায় লিখি। নারী নির্যাতন নিয়ে, নারী অধিকার নিয়ে লেখা বন্ধুমহলে আলোচ্য বিষয়। এ কথাগুলো আমায় অবাক করল। কারণ নারীর শুধু যে নিজস্ব কোনো পরিচয় থাকতে পারে, সে নিজেই নিজের পরিচয় তৈরি করা স্বতন্ত্র একজন মানুষ এ কথা ভাবার মতো নারী এ সমাজে খুবই কম। শারীরিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক সৌন্দর্যের আলো সেদিন মুগ্ধ করেছিল। পরিচয়পবর্ শেষে আমায় অবাক করে দিয়ে বললেন, বাসে আজ আমার এক ছাত্রীকে দেখলাম। যতবার তাকাচ্ছিলাম ততবারই তার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হলো। আমি ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম। সিটে বসে থাকা মেয়েটি যদি আমার ছাত্রী হতো তাহলে, আমায় দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। সে উঠে আমায় সিট দিত। অবাক কা-, সকালবেলা গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে দেখলাম, সে আমারই ছাত্রী। অথচ বাসে আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না। সবাই মুখ চাওয়া শুরু করল। কে সেই ছাত্রী তাকে নির্ধারণের চেষ্টা করল। আমি মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসছিলাম। এরপর অনেকদিন অপেক্ষা করেছি বাসে আপার সঙ্গে আমার দেখা হোক, আমি সিটটা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলব, ‘আপা আপনি বসেন’। না, আর কোনোদিন এভাবে দেখা হয়নি। এতক্ষণ ধরে যে মানুষটির কথা বলছিলাম তিনি জনাব তাহমিনা খাতুন, উপসচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর, সিলেট বিভাগ। কিছু মানুষের জীবনটা থাকে এমন আলোকিত, যে জীবন তার চারপাশের সকলকে আলোকিত করে রাখে। তাহমিনা আপা এমনই এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব। তিনি তার চারপাশে মানুষকে তাঁর আপন আলোয় আলোকিত করে রাখেন সর্বদা। সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ঘোষণা করেছে, ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার ২০১৭’ যে কজন আলোকিত মানুষের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেয়া হয়েছে তাহমিনা খাতুন তাদের মধ্যে একজন। যোগ্য মানুষের হাতেই উঠে এসেছে তার যোগ্যতা পুরস্কার। আপার দীর্ঘদিনের শ্রম আর স্বপ্নের স্বীকৃতির এই পুরস্কার শুধু তাকেই নয়, গর্বিত এবং আনন্দিত করেছে তাকে, যারা ভালোবাসে তাদেরও। সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানে পদাধিকার বলে যারা উঁচুতে অবস্থান করে তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের কাছে সমস্যার কথা সাধারণত তুলে ধরা সম্ভব হয় না। তাছাড়া দেশজুড়ে নানাভাবে নানা জায়গায় চলছে শিক্ষকদের অসম্মানের চিত্র। কয়েক বছর আগের কথা। একজন ঊধ্বর্তন কমর্কর্তা এক স্কুলে গিয়ে পরিদর্শন করে সন্তুষ্ট না হয়ে শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলে বসলেন, ‘মাসে মাসে বেতন নেন? বেতন গিলাচ্ছি।’ ডিপিও অফিসের কম্পিউটার অফিসারকে স্যার সম্বোধন না করায় রেগে উত্তর, জানেন আমার বেতন স্কেল কত? আপনি আর আমি কি সমান? যে সমাজে শিক্ষককে মূল্যায়ন করা হয় তার বেতন স্কেল দিয়ে, যে সমাজে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে অনিয়ম আবিষ্কার করে শিক্ষকদের উদ্দেশ করে বলা হয় ‘বেতন গিলাচ্ছি’ সে সমাজে শিক্ষক গুরু না হয়ে দাস বা ব্যবসায়ী হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। আমি অতি ভাগ্যবতী। কারণ আমার সঙ্গে যাদের পরিচয় হয়েছে আমি তাদের ভালোবাসা আর স্নেহের ছায়ায় এই দীর্ঘ পথ পার হয়ে এসেছি। জয়দেবপুর পিটিআই সুপার ছিলেন ১৯৯৪-৯৫ সালে কাওসার সাবিনা। বতর্মানে প্রমোশন পেয়ে এখন উচ্চপদে সমাসীন। আমরা তখন কাউকে ম্যাডাম সম্বোধন করতাম না। সবাইকে আপা ডাকতাম। দূরত্বটাও ছিল না এখনকার মতো। সুপার আপা আমায় কোনো কাজের জন্য ডাকলে বলতেন, ‘লক্ষ্মী মেয়েটাকে খবর দাও।’ ফয়জুন্নাহার আপা, হাসিনা আপা, হোসনেয়ারা আপাসহ অনেকেই তখন ছিলেন কাছের মানুষ। ফেসবুকের কল্যাণে অনেকের সঙ্গেই আবার যোগাযোগ হয়েছে। সময়ের স্রোতে হাজার হাজার ছাত্রীর ভিড়ে এখনো আমায় মনে রাখার জন্য আমি গর্বিত এবং কৃতজ্ঞ। তাহমিনা আপা খুব বেশিদিন ছিলেন না জয়দেবপুর পিটিআই-এ। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি আন্তরিকতা আর আলাদা ব্যক্তিত্ব দিয়ে জয় করেছিলেন প্রতিটি প্রশিক্ষণার্থীর হৃদয়। যেদিন অধিদফতরে চলে গেলেন সেদিন দু’চোখ জলে চলছল করেনি এমন কেউ ছিল না। বিদায় অনুষ্ঠানে। ফেসবুক আমাদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে এমন কিছু মানুষকে, যাদের সঙ্গে জীবনে হয়তো আর কোনোদিন দেখাই হতো না। ফেসবুকই আবার দেখা করিয়ে দিল তাহমিনা আপার সঙ্গে। সেই প্রাণবন্ত হাসি। সময় যা এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। হঠাৎ একটা মেসেজÑ‘এই নামে আমার একজন প্রিয় ছাত্রী ছিল জয়দেবপুর পিটিআইয়ে। তুমি কি সেই পাপিয়া?’ আমি আচমকা ফিরে গেলাম বহু বছর আগের দুরন্ত ছুটে চলা, ভালোবাসায় সিক্ত এক অন্যরকম জীবনে। ভালোবাসার অনেকগুলো মুখ, যাদের সঙ্গে ১৯৯৫ সালেই শেষবারের মতো দেখা হয়েছে। অনেকদিন পর হাজারো হতাশা, ক্ষোভ ভয়ের মাঝে এক পশলা আনন্দের বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ল এ মেসেজটিতে। আমার প্রথম বই প্রকাশের পর যাদের কথা আমার মনে পড়েছে তাদের মধ্যে তাহমিনা আপা একজন। যোগাযোগ না থাকলেও যাদের সান্নিধ্যে আমার জীবন সমৃদ্ধ তারা হৃদয়েই থেকে যান অলক্ষে। হঠাৎ ফেসবুকে দেখলাম তাহমিনা আপার শুদ্ধাচার পুরস্কারের সংবাদটি। তিনি তার শিক্ষকদের মাঝে কতটা জনপ্রিয় এবং শিক্ষকদের কতটা কাছের মানুষ তা ফেসবুকে তাকে নিয়ে শিক্ষকদের লেখা দেখলেই বোঝা যায়। শিক্ষার ক্ষেত্রে উন্নয়নে যারা সততা, নিষ্ঠা আর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, যাদের শ্রমে, সৃজনশীলতায় প্রাথমিক শিক্ষা এগিয়ে যাচ্ছে, তিনি তাদের মধ্যে একজন। ভয় দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়েই যুগে যুগে জয় করা গেছে বিশ্ব। ভালোবাসার অর্জন অনেক বেশি। তাহমিনা আপার কাছাকাছি এসে যেকোনো সমস্যা নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করা যায়। তার স্নেহের, ভালোবাসার হাত তার প্রতিটি শিক্ষকের মাথায় ছায়া হয়ে, মায়া হয়ে থাকে সর্বদা, ভয় নয়, নির্ভরতায় প্রত্যেক শিক্ষক তাকে ভালোবেসেই পালন করে তার আদেশ। এক পৃথিবী অন্ধকার দূর করার জন্য একটি সূর্যই যেমন যথেষ্ট, তেমনি সারাদেশ যখন দুর্নীতি, অনিয়ম আর ঘুষে নিমজ্জিত তখন এমনি কয়েকজন আলোকিত সৎ এবং আন্তরিক মানুষের আলোয় পথ দেখে এগিয়ে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। শিক্ষক গুরু। তার সম্মান অর্থে নয়, পদাধিকারই তার সম্মান এবং মর্যাদা বহন করে। পাহারা দিয়ে ভয় দেখিয়ে, আইনের নানা বেড়াজালে আবদ্ধ করে যে শিক্ষককে দিয়ে তার কর্মক্ষেত্রে কাজ করানো হয় সে আর যা হোক, শিক্ষক থেকে গুরু হয়ে উঠতে পারেন না। শিক্ষকতা পেশার গুরুত্ব, দায়িত্ব এবং মর্যাদা উপলব্ধির জন্য এই শুদ্ধ মানুষটির সংগ্রামী জীবন, তার পথচলা, শ্রমের কথা, তার শিক্ষকবৃন্দের কাছাকাছি গিয়ে অতি আপনজন হয়ে উঠার গল্প জানতে হবে। তার এই সুদীর্ঘ পথ চলার কর্মকা- নতুন প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয়। আমার প্রিয় শিক্ষকের হাতে শুদ্ধাচার পুরস্কার আমায় গর্বিত করে। সেই সঙ্গে গর্বিত প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার, লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের ভালোবাসা আর আশীর্বাদে সিক্ত এই মানুষটির আগামীর পথচলা আরো সুন্দর, আরো আলোকিত হবে। তার সুদীর্ঘ জীবন, সুস্বাস্থ্য আর সাফল্য কামনা করছি। শত বাধায়, শত বিপদেও তার সরল হাসি জয় করে নেবে আঁধারকেÑএ প্রত্যাশা রইল। লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018