BdNewsEveryDay.com
Wednesday, August 15, 2018

নিরাপদ সড়ক চাই

Thursday, August 09, 2018 - 145 hours ago

আবছার উদ্দিন অলি : ছাত্রদের গত কয়েক দিনের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন থেকে বুঝা যায় যে, সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে অন্যতম জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাইসেন্স বিহীন গাড়ির দৌরাত্ম্যে বুঝা যায় দর্ঘটনার দায় কার? গাড়ির চেয়ে ড্রাইভারের সংখ্যা কম হওয়াতে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়, কিভাবে চলছে এতো গাড়ি। গাড়ির লাইসেন্স, ড্রাইভারের লাইসেন্স না থাকলে সে গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটাবে এটাইতো স্বাভাবিক। তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে। প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, প্রাণহানি হচ্ছে, আবার কেউবা পঙ্গুত্ব বরণ করছে। একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না। কোনভাবেই দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। এভাবে সড়ক দুর্ঘটনা মৃত্যুর মিছিল আর কত দীর্ঘ হবে, তা আমরা কেউ বলতে পারি না। এ নিয়ে কোন আশ্বাসের বাণীও শুনছি না। বাসা থেকে বের হলেই যেন মনের মধ্যে ভয় জাগে। এই বুঝি কোনো দুর্ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি কিংবা দুর্ঘটনার কোনো দুঃসংবাদ আসছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলে দুর্ঘটনার সংবাদ দেখতে দেখতে মনকে আর ভালো রাখা যাচ্ছে না। দ্রুত গতি পরিহার করি-সড়ক মুক্ত দেশ গড়ি। আমি আপনি সচেতন হলে সড়ক দুর্ঘটনা যাবে কমে। এ বিষয়ে সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, মিছিল-মিটিং, তদন্ত কমিটি সবকিছু হলেও কার্যত ফলাফল শূন্য। বর্ষার অতি বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও সড়ক মহাসড়কে এমনকি পাড়া মহল্লার অলি-গলিতে রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে চলছে, আগামীতেও ঘটবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে বছরে বাংলাদেশে ৮ হাজার ৬৪২ জন সড়ক দুর্ঘনায় নিহত হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুজনিত কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও কম না। নিহত হলে ২০ হাজার এবং আহত হলে ৫ হাজার। কখনো কখনো মধ্যস্বত্ব ভোগীর কারণে নিহত ব্যক্তির পরিবার ও আহত ব্যক্তি এ টাকা পান না। দুর্ঘটনা এড়াতে সরকার মহাসড়কে টেক্সি চলাচল বন্ধ করলে অন্যদিকে গণপরিবহণ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে মহাসড়কে গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা প্রয়োজন ছিল। সবকিছুতেই সমন্বয়হীনতা বাস্তব চিত্র ফুটে উঠছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও প্রমিসেস মেডিকেল লিমিটেডের গবেষণা অনুযায়ী মাদকাসক্ত চালকের কারণে দেশে ৩০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। মালিক, চালক ও সরকার এই তিন পক্ষকে দুর্ঘটনা বিষয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এক হতে হবে এবং কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে এই দায় এড়ানো যাবে না। অনভিজ্ঞ ড্রাইভার, এক ড্রাইভার দিয়ে দৈনিক ১৮ ঘন্টারও বেশি সময় গাড়ি চালানো, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, ফিটনেস বিহীন গাড়ি চলাচল এবং রাস্তার বেহাল দশা, মহাসড়কে দূরপার্লার গাড়ির সাথে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ভ্যানগাড়ি, ঠেলাগাড়ি, ট্রাক্টর, রিক্সা, টেক্সি, সাইকেল, মোটরগাড়ি, লবণবাহী গাড়ি ইত্যাদি চলাচলের কারণে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কে নিরীহ পথচারী, সবচেয়ে অরক্ষিত সড়ক ব্যবহারকারী, তাকে কোনো গাড়ি আঘাত করলেই পরিণতি খুব খারাপ হয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ৫৮ শতাংশ পথচারীই রাস্তায় মারা যাচ্ছে। মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩ শতাংশ। পশ্চাতে যে সংঘর্ষটা হয়, সে ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ এবং গাড়ি উল্টে রাস্তা থেকে পড়ে গিয়ে আরও ৯ শতাংশ মারা যায়। পথচারীর স্বভাবতই সুরক্ষা থাকে, যখন সে হাঁটে, তখন কিন্তু একটা যানবাহন এসে তাকে আঘাত করতে পারে না। এটাই রীতি। পথচারীর জন্য যে পথটা বরাদ্দ থাকে, সেটা হলো একটা ফুটপাত এবং রাস্তা পারাপার করার জন্য নিম্নতম পর্যায়ে হচ্ছে জেব্রা ক্রসিং এবং উচ্চমানের নিরাপদ হচ্ছে ওভারপাস অথবা আন্ডারপাস। আমরা দেখি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাস্তা পার হতে গিয়ে লোকজন মারা যাচ্ছে এবং বাকি প্রায় ৪০ শতাংশ মারা যাচ্ছে হাঁটতে গিয়ে। জাতীয় মহাসড়কে আমাদের সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ২৩ শতাংশ। আঞ্চলিক মহাসড়কে ১২ শতাংশ আর স্থানীয় সংযোগ (ফিডার) সড়কে ১৫ শতাংশ। জাতীয় সড়কে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। সেটা ফুটপাত দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। প্রশিক্ষিত, দক্ষ এবং দায়িত্ববান চালক যদি তৈরি করা যায়, তাহলে ৭০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে। রুট অনুযায়ী একক মালিকানায় গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা যেমন যে রুটে যে বাস চলবে, তা যেন একই কোম্পানির হয়। এতে করে এলোপাতাড়ি চলাচল ও আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। বাস চালক ও বাস মালিকের মধ্যে প্রতি টিপ ভিত্তিক চুক্তি বাতিল করে  দৈনিক বেতন ভিত্তিক নিয়ম চালু করতে হবে। এতে করে তারা বিশ্রামও পাবে এবং মানসিক প্রশান্তিও আসবে। টিপ ভিত্তিক ভাড়া মারতে গিয়ে বেশি রোজগারের আশায় প্রাণহানিসহ মারাত্মক দুর্ঘটনায় কবলিত হচ্ছে। প্রতিদিন যে হারে গাড়ি বেড়ে চলেছে সে অনুযায়ী ড্রাইভার বাড়েনি। তাহলে এ গাড়িগুলো কে চালায়? একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে নামিদামী গাড়িগুলো দুর্ঘটনার কবলে কম পড়ে। এর কারণ, গাড়ির মালিকরা ড্রাইভারকে নিয়মিত এবং সময়ত বেতন, বিশ্রাম ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে এবং নিয়ম কানুন মেনে গাড়ি চালাতে বাধ্য করেন। এতে করে নামিদামী গাড়িগুলো দুর্ঘটনার কবলে কম পড়ে। এছাড়াও আমাদের দেশে সংকেত চিহ্ন না বুঝার কারণে প্রায়শ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয় চালকরা। শতকরা ৯০% চালকই সংকেত চিহ্ন বুঝেন না। সংকেত চিহ্নগুলো দিলেই চালকেরা যে মানছেন, এটাও কিন্তু নয়। কারণ, অনেক সময় তিনি জানেনও না যে এই সংকেত বা চিহ্নগুলোর মানেটা কী এবং এই জায়গায় তাঁকে কীভাবে গাড়ি চালাতে হবে। বিষয়গুলো তাঁরা কিন্তু শিখতে পারছেন না। আধুনিকভাবে যে চালক তৈরি করা হয়, ওই ধরনের প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে একেবারেই নেই। সচেতনতার কথা যে আমরা বলছি, সচেতনতা কী? আমি যদি না-ই জানি যে আমাকে কীভাবে গাড়ি চালাতে হবে, তাহলে আমি সচেতন হব কী করে। আমাদের দেশে বাণিজ্যিক গাড়ি হচ্ছে বাস ও ট্রাক। প্রস্তুতকারকেরা বাসগুলোতে যেভাবে সিটসংখ্যা বসান, মালিকেরা তার থেকে কিন্তু আরও বেশি করে ফেলেন। এতে ভেতরে যে নিরাপদ সিট হওয়ার কথা, সেটা হয় না। এগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটার পর পরিণতি অনেক মারাত্মক হয়। বাসের ওপর কোনো রেলিং লাগানো মূল প্রস্তুতকারকেরা অনুমোদন করেন না। ওপরে অতিরিক্ত ওজন নিলেই বাস কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ট্রাকের ক্ষেত্রেও লোড বেশি করার জন্য লম্বা ও চওড়া করা হচ্ছে এবং উচ্চতাও বাড়ানো হচ্ছে। ওভারলোডিং কিন্তু চালক, গাড়ি ও রাস্তার জন্য খারাপ এবং ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে বেশি মারাত্মক হচ্ছে ট্রাকের দুই পাশে তিনটি তিনটি করে যে অ্যাঙ্গেল লাগানো হয়েছে এটা একটা মারণাস্ত্রের মতো বাসের সবচেয়ে দুর্বল অংশ জানালায় আঘাত করে মানুষসহ সবকিছু ছিঁড়ে ফেড়ে নিয়ে যায়। আমাদের দেশে যত লোক মারা যায়, তার ৫০ ভাগ মারা যায় দুর্ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যে। বাকি ১৫ ভাগ মারা যায় চার ঘন্টার মধ্যে এবং ৩৫ ভাগ মারা যায় হাসপাতালে। ৫০ ভাগ মারা হচ্ছে পুরোপুরি চিকিৎসার ব্যবস্থাপনার অভাবে। আমরা প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা বা ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের ব্যবস্থা করতে পারলে এদের হয়তো বাঁচানো সম্ভব। দরকার কিছু ফার্স্ট রেসপন্ডার তৈরি করা। অর্থাৎ দুর্ঘটনা যে জায়গায় ঘটবে, সে জায়গায় যদি চিকিৎসা দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে পারা যায়, তাহলে হয়তো অনেক লোককে বাঁচানো যাবে। প্রাথমিক পর্যায়ের কর্মী তৈরি করতে পেট্টোল পাম্প, সিএনজি স্টেশন বা স্থানীয় ওষুধের দোকানগুলোতে যারা কাজ করে, তাদের প্রশিক্ষিত করে ফার্ষ্ট রেসপন্ডার করতে পারি। অথবা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। দুর্ঘটনা রোধের জন্য আলাদা একটি সংস্থা করা প্রয়োজন। যে সংস্থাটি এ বিষয়টি সরেজমিনে মনিটরিং করবেন। কারণ আমাদের দেশে দুর্ঘটনা ঘটলেও কোন প্রতিষ্ঠানটি বিষয়টি দেখবাল করবে তার কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা নাই। মামলা হলেও দীর্ঘ সময়ের কারণে অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছয়টি নির্দেশনা (১) গাড়ির চালক ও তার সহকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কর। (২) লং ড্রাইভের সময় বিকল্প চালক রাখা, যাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কোনো চালকেক একটানা দূরপাল্লায় গাড়ি চালাতে না হয়। (৩) নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি। (৪) অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা। (৫) সড়কে যাতে সবাই সিগন্যাল মেনে চলে-তা নিশ্চিত করা। পথচারী পারাপারে জেব্রাক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করা। (৬) চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধার বিষয়টি নিশ্চিত করা। উল্লেখিত বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করলে সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। গাড়ির চালককে গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ড্রাইভারকে শিক্ষিত হতে হবে। কারণ তার একজনের খাম খেয়ালীপনার কারণে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। তাই সবার আগে ড্রাইভারকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে বাস্তব ধারণা দিতে হবে। মহাসড়কে গাড়ি চলাচলের নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। হঠাৎ হঠাৎ নতুন নতুন সিদ্ধান্ত দিয়ে জনসাধারণকে ভোগান্তিতে না ফেলে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যাত্রা এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। লেখক : সাংবাদিক ও গীতিকার


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018