BdNewsEveryDay.com
Wednesday, November 21, 2018

কিভাবে উদ্ধার করা হল থাই গুহায় আটকা পড়া কিশোর দল?

Tuesday, July 10, 2018 - 838 hours ago

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

চরম ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে থাইল্যান্ডের গুহায় আটকা পড়া দলটির সবাইকে বাইরে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন ডুবুরিরা।

৯০ জন দক্ষ ডুবুরির একটি দল, যাদের ৪০জন থাইল্যান্ডের এবং বাকিরা বিভিন্ন দেশের- তারা ওই গুহায় উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে। তারা থাম লুয়াং গুহার ডুবে যাওয়া অন্ধকার সংকীর্ণ পথ দিয়ে কিশোরদের দিক নির্দেশনা দিয়ে প্রবেশমুখে নিয়ে নিয়ে এসেছে।

অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই কিশোরদের একটি ক্লান্তিকর যাত্রাপথ পাড়ি দিতে হয়। যেটা কিনা অভিজ্ঞ ডুবুরিদের জন্যও ভীষণ ক্লান্তিকর ছিল।



আটকে পড়া কিশোর ফুটবল দল

এই অভিযান প্রক্রিয়া জুড়ে ছিল হাঁটা, পানির ওপর দিয়ে চলা, বেয়ে ওঠা, এবং পানিতে ডুব দিয়ে দড়ি ধরে এগিয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।

সব ডুবুরি বাড়তি সতর্কতার জন্য মুখ জুড়ে মাস্ক ব্যবহার করেন। প্রতিটি কিশোরকে দুইজন করে ডুবুরি সাহায্য করেছে। তারা ওই কিশোরের অক্সিজেন সরবরাহের ট্যাঙ্কও বহন করে।

তবে গুহার সবচেয়ে জটিল অংশটি হল অর্ধেক পথের "টি-জংশন"। যেটা এতোটাই সংকীর্ণ যে তার ভেতর দিয়ে যাওয়ার জন্য ডুবুরিদের অক্সিজেন ট্যাঙ্কটি খুলে ফেলতে হয়েছে।



কিশোরদের উদ্ধারের আগে গুহা থেকে পাম্প করে পানির স্তর নামিয়ে আনা হয়।

ওই সুড়ঙ্গের বাইরে রয়েছে আরেকটি স্থান যার নাম দেয়া হয়েছে চেম্বার থ্রি। যেটা ডুবুরিদের জন্য ফরোয়ার্ড বেইজে পরিণত হয়।

সেখানে কিশোররা বাকি পথ পাড়ির দেয়ার আগে কিছু সময় জিরিয়ে নিতে পারে। পরে তারা পায়ে হেটে সহজেই প্রবেশমুখে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে তাদের চিয়াং রায়ের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া এক প্রাক্তন থাই নৌবাহিনীর ডুবুরির মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে এই যাত্রা কতোটা বিপজ্জনক ছিল।

সামান গুনান নামে ওই ব্যক্তি শুক্রবার গুহার মধ্যে দিয়ে কিশোরদের অক্সিজেন ট্যাঙ্ক দিয়ে ফিরছিলেন। এ সময় পানির ভেতরেই অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান তিনি।

তিনি প্রথমে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, পরে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার সহকর্মীরা জানান, "তাদের বন্ধুর এই আত্মত্যাগ তারা বৃথা যেতে দেবে না।"

উদ্ধার অভিযানের প্রধান বলেন, অভিযানের দ্বিতীয় দিনটি প্রথম দিনের তুলনায় আরো মসৃণভাবে পরিচালিত হয়েছে। প্রতিবার ডুবুরিদের দুঘণ্টারও কম সময় লেগেছে।

একটি বিশাল পাম্পিং মেশিন দিয়ে গুহার ভেতরের পানির স্তর নীচে নামিয়ে আনা হয়। যা পুরো যাত্রাকে আরো সহজ করে তোলে।

ওই দলটি সেখানে কিভাবে পৌঁছল?

এক সপ্তাহ আগে এক ব্রিটিশ উদ্ধারকারী ডুবুরি গুহার প্রবেশমুখ থেকে চার কিলোমিটার ভেতরে ওই স্থানটিতে দলটির সন্ধান পায়।

১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী ওই কিশোররা স্থানীয় ফুটবল দল ওয়াইল্ড বোয়ারসের সদস্য বলে জানা গেছে।

 



রাফায়েল (বাঁয়ে) এবং তার ছেলে ডুবুরিদের দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন।

দলটি তাদের কোচের সঙ্গে ভ্রমণে বের হতে গিয়ে এই গুহায় প্রবেশ করে এবং ভেতরে আটকা পড়ে।

নিখোঁজের নয় দিন পর তাদেরকে গুহার গভীর অন্ধকারে পাওয়া যায়।

ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল পরিচালনাকারী সংস্থা ফিফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এই কিশোরদের রোববার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মস্কোর ফাইনাল খেলা মাঠে বসিয়ে দেখানো হবে।

তবে তারা এই প্রস্তাব গ্রহণ করার মতো ভাল অবস্থায় থাকবে কিনা, সেটা বিবেচনা করা হবে।

কারা ওই কিশোর? তাদের কোচই বা কে?

ওই ফুটবল দলের সদস্য এবং তাদের কোচের কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

ক্যাপ্টেন ডুগানপেট প্রমটেপ- বয়স ১৩ বছর, তিনি দলের অত্যন্ত সম্মানিত সদস্য যিনি দলকে উজ্জীবিত রাখতে কাজ করেন। তিনি থাইল্যান্ডের বেশ কয়েকটি পেশাদার ক্লাব থেকে স্কাউটিংয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

আদুল স্যাম-অন- ১৪ বছর বয়স, মিয়ানমার বংশোদ্ভূত, কয়েকটি ভাষায় কথা বলতে পারেন এবং দলের একমাত্র সদস্য যিনি ব্রিটিশ ডুরিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন। যারা সর্বপ্রথম তাদের সন্ধান পায়।

 



ফেসবুকের ছবিতে আটকে পড়া কয়েকজন কিশোরের সঙ্গে তাদের কোচ।

পিরাপাত সোমপিয়াংজাই- বয়স ১৭ বছর, যেদিন তারা গুহায় আটকে পড়ে অর্থাৎ ২৩ জুন তার জন্মদিন ছিল। তার জন্মদিন উদযাপনের জন্য সবাই যে খাবারগুলো এনেছিল, সেগুলোই তাদের এতদিন টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।

একাপোল চান্টাওং- বয়স ২৫ বছর, দলের সহযোগী কোচ, উদ্ধারকারীদের মতে তিনি সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় আছেন। কারণ তিনি বার বার খাবার খেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং তার পরিবর্তে সেগুলো ওই কিশোরদের খেতে বলেছেন।

থাই নৌবাহিনীর এক সদস্য তার ফেসবুকে জানান, "পুরো কাজ চলছে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। অ্যাম্বুলেন্সগুলো যখন গুহার প্রবেশদ্বার থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছিল। তখন গাড়ির হেডলাইটের ঝলকানিতে দেখতে পেলাম আরেকটি ছেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এভাবে প্রত্যেকের মধ্যে আশা জেগেছে।"

এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানটি খুবই সূক্ষ্মতা ও সাবধানতার সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু এই উদ্ধার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন একদিকে যেমন ছিল সাহসী, বিপজ্জনক তেমনি ভীষণ জটিল।

তবে সব সংকটের মধ্যেও প্রতিটি পর্যায়ে সাফল্য এসেছে। এই মানসিক স্বস্তি ধীরে ধীরে সবাইকে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে থাকা উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা থেকে পরিত্রাণ দিয়েছে।

এখানে আরেকটি রাত বিরতি নেয়া হচ্ছে। কেউই তাড়াহুড়া করতে চায়না। চারিদিক থেকে ডুবুরি দলের নিষ্ঠা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রশংসা আসছে। 

সূত্র: বিবিসি বাংলা


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018