BdNewsEveryDay.com
Sunday, December 15, 2019

প্রয়োজন সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন

Sunday, December 01, 2019 - 339 hours ago

ওলীউর রহমান : এইচআইভি/এইডস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১লা ডিসেম্বরকে বিশ্ব এইডস দিবস ঘোষণা করেছে। ১৯৮৮ সাল থেকে ১লা ডিসেম্বরকে বিশ্ব এইডস দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আধুনিক বিশ্বের আতঙ্ক সৃষ্টিকারী এক মরণব্যাধীর নাম হচ্ছে এইড্স। একমাত্র এইডস্ই হলো এমন ব্যাধী যার মরণ কামড়ে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। মৃত্যু আর আতংকের আরেক নাম হলো এইড্স। এইচআইভি হলো এমন একটি ভাইরাস যা মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। এ ভাইরাসটি মানব দেহের রক্তের শ্বেত কণিকা বা সাদা কোষগুলো নষ্ট করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অকার্যকর করে ফেলে। আর এইডস হলো অর্জিত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির লক্ষণ সমষ্টিকে এইডস বলা হয়। এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে এইডস। এইচআইভি হলো ভাইরাস আর এইডস হলো এইচআইভি ভাইরাস জনিত সংক্রমণের অনেকগুলি লক্ষণ ও চিহ্নের সমষ্টিগত অবস্থা। মানুষের শরীরের চারটি তরল পদার্থ রক্ত, বীর্য, যোনিরস ও বুকের দুধে এইচআইভি বাস করে। তাই এইচআইভি আছে এমন ব্যক্তির সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হলে বা এমন ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করলে এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। সুঁই সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করে নেশা গ্রহণের মাধ্যমে এবং এইচআইভিতে আক্রান্ত মা থেকে শিশুতে গর্ভাবস্থায়, প্রসবকালে বা বুকের দুধ পানের মাধ্যমে এইচআইভির সংক্রমণ ঘটতে পারে। এ কারণে কোন অসুস্থ ব্যক্তিকে যদি রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে রক্ত গ্রহণের আগে এতে এইচআইভি আছে কি না তা অবশ্যই পরীক্ষা করে নিতে হবে। আর যৌন সংসর্গের ক্ষেত্রে অবশ্যই ইসলাম বর্হিভূত যৌন আচরণ পরিহার করতে হবে। এইচআইভি ধরা পড়ার পরে বিশ্বের অনেক চিকিৎসা বিজ্ঞানী যৌনসংসর্গের ক্ষেত্রে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার পরামর্শ দেন। ইসলামে অবাধ যৌনাচার তথা বিবাহ বহির্ভূত যৌন আচরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর জন্য মৃত্যুদন্ড শাস্তি ধার্য করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা বনী ইসরাঈলের ১৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, এটা অশ্লীলতা ও মন্দ পথ।’ এইচআইভি রোগীর সর্বপ্রথম খবর পাওয়া যায় ১৯৫৯ সালে আফ্রিকা মহাদেশের কঙ্গোর কিনশাশায়। ১৯৭৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ভাইরাসটি জায়গা করে নেয়। ১৯৮১ সালে নিউইয়র্ক ও ক্যালিফুর্নিয়ার দু’জন লোক এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। তারা দুজনই ছিল সমকামী। বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন সংস্থার জরিপ থেকে জানা যায় যে, ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে এইচআইভি/এইডসে সংক্রমিত হয়েছে ৬ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ। এর মধ্যে প্রায় তিন কোটি মানুষ এইডসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতি বছর সারা বিশ্বে ৪০ লক্ষের বেশি মানুষ এইডসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং প্রতিদিন সারা বিশ্বে ১১ হাজার মানুষ নতুন করে এইচআইভি দ্বারা সংক্রমিত হয়। বিশ্বের সর্বাধিক এইচআইভি সংক্রমিত দেশ হলো দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৭ লক্ষের উপরে। সাহারা অধ্যুষিত আফ্রিকায় বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ মানুষ বসবাস করে। অথচ দুঃখজনক ব্যাপার হলো এদের দুই তৃতীয়াংশের ও বেশী মানুষ এইচআইভি বহন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এইডস রোগীর সংখ্যা ছিল ২০০৪ সালে সাড়ে ৯ লক্ষ। আবার পশ্চিম ইউরোপে ছিল প্রায় ছয় লক্ষ। এশিয়াতে সমকামী, মাদকসেবী, যৌনকর্মী এবং তাদের খদ্দেরদের দ্বারা এইডস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভিয়েতনামের অবস্থা খুবই নাজুক। বিশ্বের ৬০ ভাগ মানুষের বসবাস এশিয়াতে। তাই এশিয়াতে এইডস দ্রুত ছড়ানো মানেই মানব জাতির জন্য ভয়াবহ বিপদ। এশিয়ার সর্বাধিক এইচআইভি সংক্রমিত দেশ হলো আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। এখানে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা বেসরকারি হিসাবে  অর্ধ কোটির কাছাকাছি। বাংলাদেশে সর্ব প্রথম এইডস রোগীর শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ হাজার জন রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত মারা গেছে ১ হাজারের বেশি। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে বর্তমানে এইডসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার। বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশও এইচআইভি সংক্রমনের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পুরুষ-মহিলা যৌন কর্মীদের আধিক্য, মাদকাসক্তি, এইচআইভি সম্পর্কে অজ্ঞতা, বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালনের অপ্রতুলতা এবং আমাদের ভৌগলিক অবস্থানের কারণে আমরা এইচআইভি/এইডসের মারাত্মক ঝুঁকির  মধ্যে রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বিভিন্নভাবে অনুপ্রবেশ করতে পারে এইচআইভি আমাদের দেশে। এছাড়া বিভিন্নভাবে যারা এইচআইভি/এইডসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জনশক্তি যেমন বিভিন্ন পর্যায়ের যৌনকর্মী এবং তাদের খদ্দের, মাদকসেবী ও হিজড়া সবমিলিয়ে এই ঝঁকিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা কয়েক লক্ষ হয়ে যাবে। এদেরকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তা হলে এইচআইভি মহামারীর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কারণ পর্যায়ক্রমে যদি এরা এইচআইভি সংক্রমিত হয় তাহলে বাংলাদেশে এইচআইভি মহামারী দেখা দিতে পারে। এজন্য এখন থেকেই আমাদেরকে সজাগ এবং সর্তক হতে হবে। সতর্কতা অবলম্বন না করলে যেকেউ এইচআইভিতে আক্রান্ত হতে পারে। গণসচেতনতার পাশাপাশি অবাধ যৌনাচার, অশ্লীলতা ও নগ্নসংস্কৃতি অবশ্যই পরিহার করতে হবে। পতিতাবৃত্তিতে লিপ্তদের এ পেশা থেকে ফিরিয়ে এনে এদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এদেরকে স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত করতে হবে। মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এইচআইভি পরীক্ষা সহজলভ্য করতে হবে। সেলুনের ব্লেড ও হাসপাতালগুলোতে দাঁতের চিকিৎসা ও  অস্ত্রোপাচারের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে জীবাণু মুক্ত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। বিদেশ থেকে আসা লোকদেরকে বিমানবন্দরে রক্ত পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করতে হবে। যারা ইতিপূর্বে এইচআইভি আক্রান্ত হয়েগেছে তাদেরকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে যাতে তারা নতুন করে এইচআইভি ছড়াতে না পারে। আর শুধু সতর্কতা অবলম্বন করলেও হবে না বরং চারিত্রিক সংশোধনও প্রয়োজন। কারণ পৃথিবীর অতীত ইতিহাস বলে যে, অবাদ যৌনাচারের কারণে বহুজাতি আল্লাহর আযাবে নিপতিত হয়ে ধ্বংস হয়েছে। যেমন আল্লাহর নবী হযরত লুত আ. এর জাতি সমকামিতায় লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহপাক তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছেন। বনী ইসরাঈল সম্প্রদায় একবার নারীদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল। আল্লাহপাক তাদের উপর প্লেগ রোগ প্রেরণ করে দিয়েছিলেন ফলে একদিনেই ৭০ হাজার লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল। অতঃপর তারা তাওবা করায় আল্লাহপাক তাদেরকে ক্ষমা করেছিলেন। সর্বোপরি এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে যত প্লান-পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে, তার সাথে মানুষের চারিত্রিক সংশোধনের বিষয়টাকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। আর চারিত্রিক পরিশোধনের একমাত্র পথ হচ্ছে ইসলাম। জনসচেতনতার পাশাপাশি মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং বিশ্বনবী স. এর বাণীর উপর গবেষণা চালিয়ে ব্যভিচার, সমকামিতা এবং সকল প্রকার বেহায়াপনা ও এর সহায়ক প্রবণতাগুলোকে নির্মূল করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্বের যেখানেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে সেখান থেকেই এইডস তাড়ানো সহজ হবে। লেখক : মাওলানা মুহাম্মদ ওলীউর রহমান, প্রচার সম্পাদক, জাতীয় ইমাম সমিতি, সিলেট জেলা।


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018