BdNewsEveryDay.com
Thursday, November 14, 2019

বাড়ছে ভুট্টা চাষ, ধানের চেয়েও লাভ বেশি

Saturday, June 15, 2019 - 838 hours ago

আমাদের দেশে প্রায় রবি ও খরিফ মৌসুম মিলে ১০ লক্ষ একর জমিতে ভুট্টা চাষ হয় (উৎস: কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০১৭) এবং সারা বাংলাদেশ দিন দিন ভুট্টার চাষ বাড়ছে। রবি মৌসুমে প্রায় ৯-৯.৩ লক্ষ একর এবং খরিফ মৌসুমে প্রায় ১-১.৫ লক্ষ একর জমিতে ভুট্টার চাষ হয়। রবি মৌসুমে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৯ লক্ষ একর জমিতে ভুট্টার বীজ বপন করা হয়, ১৪% আর্দ্রতায় অর্থাৎ সম্পূর্ণ শুকিয়ে কৃষক ফলন পায় একরে প্রায় ১২৬ মণের মত। তাহলে মোট ফলন হয় ৯ লক্ষ একর x ১২৬ মণ = ১১,৩৪,০০,০০০ মণ। এটাকে যদি ২৭.৫ মণ দিয়ে ভাগ দেই (২৭.৫ মণে এক টন) তাহলে উৎপাদন হয় প্রায় ৪১ লক্ষ টনের মত। খরিফ মৌসুমে অর্থাৎ মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য মে মাস পর্যন্ত প্রায় ১-১.৫ লক্ষ একর জমিতে ভুট্টার বীজ বপন করা হয়। রবির মত যদি খরিফ মৌসুমেও ক্যালকুলেশন করি তাহলে ১ লক্ষ একর x ৯০ মণ = ৯০০০০০০ মণ। এটাকে যদি ২৭.৫ মণ দিয়ে ভাগ দেই (২৭.৫ মণে এক টন) তাহলে উৎপাদন হয় প্রায় ৩.৩ লক্ষ টনের মত। অতএব, রবি + খরিফ মৌসুমে মোট উৎপাদন হয় = ৪০ + ৩.৩ = ৪৩.৩ লক্ষ মেট্রিক টন। আমরা জানি, পোল্ট্রি খাতে বছরে ফিডের চাহিদা প্রায় ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন (Source: Light Castle Partners. Market Insight: Bangladesh Feed Industry: June 7, 2017) এবং মৎস্য ও পশুসম্পদ খাতে ফিডের প্রয়োজন প্রায় ২৭ লক্ষ মেট্রিক টন, যার ৫০% এরও বেশি আসে ভুট্টা থেকে। পোল্ট্রি ফিড তৈরি করতে যে সমস্ত উপাদান লাগে তার মধ্যে ৫৫-৬৫% ভুট্টা, ২০-২৫% সয়াবিন মিল, ১০-২৫% সরিষার খৈল, ১০-২০% ধানের কুঁড়া এবং ১০-২০% হাড়ের গুড়া অর্থাৎ ফিড তৈরির কাঁচা মালের ৫০% এরও বেশি আসে ভুট্টা থেকে। বিভিন্ন এলাকায় যেমন- নওগাঁ, দিনাজপুর, বগুড়া ও রংপুর এলাকার কৃষক ভাইদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ১ বিঘা জমিতে (৩৩ শতাংশ) বোরো মৌসুমে মোট ধান উৎপাদন করতে খরচ হয় ১১,৭৯০/- টাকা (আমন মৌসুমে খরচ কম লাগে প্রায় ১০ হাজার টাকার মত। কারণ এ সময় সেচের খরচ কমে যায়)। যদিও বর্তমান সরকার সার ও সেচ প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে। ধান চাষের খরচের মধ্যে থাকে জমি লিজ ও তৈরিকরণ, বীজ, সার, সেচ, আগাছা দমন, আন্তঃপরিচর্যা, বালাই দমন, মাড়াই, ঝাড়াই, বস্তাবন্দীকরণ ও বাজার পর্যন্ত পৌঁছানোর খরচ। এতকিছুর পরেও বিঘা প্রতি ফলন হয় ২২-২৫ মণের মত, যার ভরা মৌসুমে বাজার মূল্য ৫১০-৫৫০ টাকা প্রতি মণ। তাহলে ১ বিঘা জমি থেকে মোট উৎপাদন মূল্য ২২ মণ x ৫১০ টাকা = ১১,২২০/- টাকা। অতএব বিয়োগ বিক্রয় মূল্য থেকে যদি উৎপাদন খরচ বাদ দেই তাহলে দাঁড়ায় (১১,২২০-১১,৭৯০) = (-৫৭০ টাকা) যা বিঘা প্রতি লোকসান। আবার মণ প্রতি হিসাব করলে লোকসান দাঁড়ায় ২৬ টাকা। পাশাপাশি ভুট্টা চাষ করলে বিঘা প্রতি খরচ হয় ১১,৪৮১/- টাকা। আর ১৪% আর্দ্রতায় ফলন হয় প্রায় ৪০ মণ, যার ভরা মৌসুমে বাজার মূল্য ৫০০ টাকা মণ। অতএব, বিঘা প্রতি আয় প্রায় = ৪০ মণ x ৫০০ টাকা = ২০,০০০/- টাকা। ধানের মত একই ভাবে হিসাব করলে দাঁড়ায় বিয়োগ বিক্রয় মূল্য থেকে যদি উৎপাদন খরচ বাদ দেই তাহলে দাঁড়ায় (২০,০০০-১১৪৮১) = ৮৫১৯/- টাকা বিঘা প্রতি লাভ। আবার মণ ধরে হিসাব করলে ভুট্টাতে ২১৩ টাকা লাভ হয় প্রতি মণে। বাস্তবতার প্রেক্ষিতে আমরা যদি চিন্তা করি কেন ভুট্টা চাষ দিন দিন বাড়ছে, তাহলে যে বিষয়গুলো আমাদের নজর আসে সেগুলো হলো- • পোল্ট্রি, মৎস্য ও পশুসম্পদ শিল্পের জন্য ফিডের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। • আমাদের দেশে প্রায় ৪ কোটি ৪৮ লক্ষের মত যুব সমাজ, যার বেশির ভাগই ফাস্ট ফুল পছন্দ করে। বিশেষ করে শহর এলাকায় যারা থাকে, আর ফাস্ট ফুডের প্রধান নিয়ামকই হল পোল্ট্রি। • ইদানীংকালে স্কুল গোয়িং ছেলে-মেয়েরা তাদের টিফিনের জন্য ফাস্ট ফুল পছন্দ করে। যারা আমরা বাবা-মা আছি আমরাও তাতে শায় দিচ্ছি, কারণ আমরা টিফিনটা রেডিমেড পাচ্ছি এবং তাতে সময়ও বাঁচছে। • বর্তমানে আমাদের দেশের অধিকাংশ ছোট-বড় নদীতে পানির প্রবাহ না থাকায়, নদীগুলো দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছ এবং নদীর বেশির ভাগ এলাকায় চর পড়ে যাচ্ছে। যেখানে অন্যান্য ফসলের তুলনায় ভুট্টা ফলন খুব ভালো হয়। যেমন- তিস্তার চর, যমুনার চর, এছাড়াও আরও অনেক নদীর চরে ইদানীং প্রচুর ভুট্টা চাষ হচ্ছে। এক সময় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার অধিকাংশ এলাকা মঙ্গা পীরিত এলাকা বলে পরিচিত ছিল কিন্তু ভুট্টা তাদের জীবনে আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে। • ভুট্টার সঙ্গে অন্যান্য ফসল যেমন- লেগুম শস্য, পেঁয়াজ, আলু ও বাদাম আন্ত:ফসল ও মিশ্র ফসল হিসাবে চাষ করা যায়, ফলে এক্ষেত্রে কৃষকরা অধিক লাভবান হন এবং ভুট্টা চাষে আগ্রহী হয়। • এছাড়াও ভুট্টা C4 (সি ফোর) উদ্ভিদ হওয়ায় কারণে সোলার শক্তিকে কাজে লাগতে পারে এবং পর্যাপ্ত সেচের ব্যবস্থাপনা না থাকলেও খরা সহ্য করে ভুট্টা গাছ তার স্বাভাবিক ফলন নিশ্চিত করতে পারে। • ইদানীংকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় জুম চাষের পরিবর্তে ভুট্টা চাষ ব্যাপক হারে বাড়ছে। • সেচ কম লাগার কারণে বিদ্যুৎ এর খরচ কম হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির লেয়ারের কোন ক্ষতি হয় না, যা পরিবেশের ভারসাম্যকে রক্ষা করে। • ভুট্টাতে রোগ ও পোকা মাকড়ের আক্রমণ অত্যন্ত কম, ফলে উৎপাদন খরচও কম। যে কারণে কৃষকরা ভুট্টা চাষে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। • বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক দেশি ও বিদেশি বড় বড় ফিড মিল কারখানা তৈরি হওয়ায় কৃষকদের ভুট্টা বিক্রি নিয়ে তেমন বড় কোন সমস্যায় বা বিপাকে পড়তে হয় না। • বর্তমানে উন্নত শপিংমল ও ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে সুইট কর্ণ (যা কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যায়, যাতে দুধের পরিমাণ বেশি থাকে) এবং রাস্তার পাশে বিভিন্ন দোকানে পপকর্ণ (খই ভুট্টা) বিক্রির পরিমাণ বাড়ছে। • এছাড়াও ডেন্ট টাইপ (দাঁতের মত দানা) ও ফ্লিন্ট টাইপ (শক্ত ও গোলাকার) ভুট্টা থেকে প্রচুর পরিমাণে স্টার্চ পাওয়া যায়, যা খাদ্য ও শিল্পজাত বস্তু হিসাবে ব্যবহার হয়। • তাছাড়া মোচা তোলার পরে ভুট্টা গাছের অবশিষ্টাংশ কৃষক তাদের বাড়িতে জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করতে পারে এবং ওপরের সবুজ পাতাগুলোকে গরুকে খাওয়াতে পারে। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, ১ বিঘা জমিতে ধান চাষ করে কৃষকের প্রায় ৫৭০ টাকা লোকসান হয় এবং বিক্রি নিয়েও রয়েছে নানা প্রকার ঝক্কি-ঝামেলা কিন্তু অন্যদিকে যদি আমরা দেখি ১ বিঘা জমিতে ভুট্টা আবাদ করে কম খরচে কৃষকের প্রায় লাভ হচ্ছে ৮,৬০৯/- টাকা। তাছাড়া বিক্রি নিয়ে তেমন একটা টেনশনে অসহায় কৃষকদের পড়তে হয় না। উপরোল্লিখিত কারণে আমাদের দেশে ভুট্টার চাষ বাড়ছে এবং আগামী দিনগুলোতে চাষ বাড়তেই থাকবে, যা আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য ধান চাষকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। বর্তমানে আমাদের প্রচুর ধান মজুদ আছে, সামনের আমন মৌসুমের পর আবার নতুন ধান আগের মজুদের সঙ্গে যুক্ত হবে। তাই আগামী বোরো মৌসুমের আগেই ধানের আকর্ষণীয় মূল্য নির্ধারণ, ক্রয় করার পদ্ধতি বা ধান ক্রয় করার ক্লিয়ারকাট গাইড লাইন, ক্রয় করার পরিমাণ ও সেই সঙ্গে মজুদ করার ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা, এই দিক নির্দেশনাগুলো কৃষকের কাছে বোরো মৌসুমের আগেই পরিষ্কারভাবে না পৌঁছালে, কৃষক ধান চাষে বিমুখ হয়ে ভুট্টা চাষের দিকে স্বাভাবিক ভাবেই ঝুঁকে পড়বে। তাই আমরা চাই রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, ফ্লাইওভার ও শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সরকার যদি অসহায় কৃষকের কষ্টের কথাগুলো মাথায় রেখে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে কৃষক বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে আমরা বাঁচবো, আমরা বাঁচলে দেশ উন্নত থেকে উন্নতর দিকে এগিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে পরিচিত লাভ করবে। আশাকরি কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018