BdNewsEveryDay.com
Tuesday, September 17, 2019

সব বৃদ্ধিই স্বাভাবিক ও উন্নতির পরিচায়ক নয়

Monday, February 11, 2019 - 838 hours ago

আশিকুল হামিদ : বৃদ্ধিকে যদি উন্নতির মাপকাঠি ধরা হয় তাহলে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন হয়ে পড়া বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। উন্নতির সে ধারা এখনো অব্যাহতও রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ক্ষেত্রগুলোর সবই আবার আশান্বিত হওয়ার মতো নয় বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভীতিকর। যেমন বাংলাদেশ বাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে কোটিপতিদের সংখ্যাবৃদ্ধি সম্পর্কিত এক সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বও শেষে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীদের সংখ্যা যেখানে ছিল ৬২ হাজার ৩৮ জন সেখানে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বও শেষে তাদের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭২ হাজার ৮১২ জন। অর্থাৎ বিগত মাত্র দুই বছরেই কোটিপতিদের সংখ্যা বেড়েছে ১০ হাজার ৭৭৪ জন এবং তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ব্যাংকের আমানতকারী। রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যক্তিদের সংখ্যা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বও শেষে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪৩-এ। পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে তাদের সংখ্যা ছিল ৯৪১। ব্যাংকে এক কোটি টাকা আমানত রেখেছেন এমন ব্যক্তিদের সংখ্যা ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বও শেষে ছিল ৫৪ হাজার ৯৭০। এক বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৭ হাজার ২৩৯। এই হিসাবে এক কোটি বা তার বেশি পরিমাণ আমানতকারীদের সংখ্যা বেড়েছে দু’ হাজার ২৬৯। এভাবে কোটিপতিদের সংখ্যাবৃদ্ধির বিষয়টিকে কিন্তু অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞদের কোনো অংশই স্বাভাবিক বলেননি। তারা বরং এই বৃদ্ধিকে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বিপদজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এরকম আরো একটি বিষয় হিসেবে সম্প্রতি অরো একবার প্রধান্যে এসেছে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড। এ নিবন্ধটি লেখার দিন, ১০ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রধান খবরের শিরোনাম দেখে থমকে যেতে হলো- ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ হবে তো’(?)। খবরে ২০০২-০৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের পরিসংখ্যান জানাতে গিয়ে বলা হয়েছে, এসব হত্যাকান্ডে ১৬ বছরে প্রাণ হারিয়েছে ২৩৯৩ জন। নিহতদের মধ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছে ৪২৯ জন, যাদের মধ্যে পরবর্তীকালে ৫২ জনের লাশ পাওয়া গেছে। দৈনিকটির রিপোর্টে ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান জানাতে গিয়ে বলা হয়েছে, এ বছরের মে থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে ২৯২ জন। এদের সকলেই নাকি মাদকবিরোধী অভিযানের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ তারা মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল কিংবা নিজেরাই ছিল মাদকাসক্ত।   তথ্যটির মধ্য দিয়ে দৈনিকটি জানাতে চেয়েছে, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড শুধু চলছেই না, বেড়েও চলেছে আশংকাজনকভাবে। অত্যন্ত ভীতিকর হলেও কথা কিন্তু অসত্য নয়। কারণ, মাত্র মাসখানেক আগে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রÑ আসক এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বেড়েছে ২৮৭ শতাংশ। আসকের ওই রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের দিক থেকে গত বছর সর্বাধিক সংখ্যক মানুষ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছে। নিহতদের সংখ্যা ৪৬৬। এদের মধ্যে মাদক বিরোধী অভিযানে মারা গেছে ২৯২ জন। দৈনিকটির পরিসংখ্যানেও সেটাই জানা গেছে। আসকের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, আগের বছর ২০১৭ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডে প্রাণ হারিয়েছিল ১৬২ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বৃদ্ধির হার ২৮৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত বছরজুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডÑ বিশেষ করে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ এবং গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনা অব্যাহত ছিল। মে মাস থেকে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে ২৯২ জন। বেআইনি আটক ও গণগ্রেফতারসহ বিভিন্ন বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব মৃত্যুর পাশাপাশি গায়েবি মামলার ব্যাপারেও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার। আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে গুম করা হয়েছে ৩৪ জনকে, যাদের মধ্যে ১৯ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাকিদের সম্পর্কে আর কিছুই জানা যায়নি। ফলে ধরে নেয়া হয়েছে, তারা বিচারবহির্ভূত হত্যায় প্রাণ হারিয়েছে। এর বাইরে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৪৭০টি সহিংসতার ঘটনায় মারা গেছে ৩৪ জন। ২০১৮ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার ৭৩২ জনের মধ্যে ৬৩ জন ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে সাতজন। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ৮১৮ জন। তার আগের বছর ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭২৪। আসকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যার পাশাপাশি নারী ও শিশু ধর্ষণও ২০১৮ সালে অনেক বেড়ে গেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই এসব তথ্য-পরিসংখ্যান অত্যন্ত আশংকাজনক। বিশেষ করে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিচারবহির্ভ’ত হত্যাকান্ড ২৮৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার তথ্যটির মধ্য দিয়ে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির চিত্র তো ফুটে উঠেছেই, একই সঙ্গে বিভিন্ন বাহিনীর বেপরোয়া হয়ে ওঠার দিকটিও প্রাধান্যে এসেছে। যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য এমন অবস্থা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর গুম ও হত্যাসহ বেপরোয়া কর্মকান্ড প্রসঙ্গে দেশের ভেতরে যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তেমনি অসংখ্য উপলক্ষে তীব্র সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত বিচারবহির্ভ’ত হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সোচ্চার হয়েছে। বলেছে, প্রতিটি বাহিনীর সদস্যদের জন্য জবাবদিহিতা এবং শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে সরকার ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং ২০০৯ সালের সন্ত্রাস দমন আইনসহ এমন কিছু আইনকে অবলম্বন করেছে ও যুক্তি হিসেবে সামনে এনেছে, যেগুলোর আড়াল নিয়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো যে কোনো বেআইনি কর্মকান্ডকেই গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টা চালানো সম্ভব। বাস্তবে তেমন প্রচেষ্টা চালানো যেমন হয়েছে তেমনি এখনো চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের কোনো প্রচেষ্টাই কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমর্থন লাভ করতে পারেনি। দেশের ভেতরে সরকারের প্রচেষ্টা বরং প্রচন্ড নিন্দা-সমালোচনার মুখে পড়েছে। যেমন আসকও জাতিসংঘের সুরে ও ভাষাতেই সকল বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিষয়ে কমিশন গঠন করে তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতো দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও মনে করেন, সরকারের উচিত জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের পাশাপাশি আসকের মতো দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনের উপস্থাপিত রিপোর্টের মূলকথাগুলো অনুধাবন করে নিজেদের নীতি-কৌশল সংশোধন করা এবং বিভিন্ন বাহিনীর লাগাম টেনে ধরা। কারণ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মতো দেশের ভেতরেও যখন অভিযোগ উত্থাপিত হয় তখন সরকারের তো বটেই, বাংলাদেশেরও ভাবমর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণœ হয়। এমন অবস্থা দেশ এবং সরকারের ভবিষ্যতের জন্য শুভ হতে পারে না। সুতরাং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং মানুষকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করার বাধাহীন সুযোগ দিতে। এ উদ্দেশ্যে সরকারের উচিত আইন-শৃংখলা বাহিনীগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা, দেশে যাতে আর কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটতে না পারে। গুম এবং ধর্ষণের মতো বিষয়গুলোতেও সরকারকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে সক্রিয় হতে হবে। কারণ, একথা বুঝতে হবে, সব দেশেই গুম ও গুপ্তহত্যার মতো বিচারবহির্ভূত কর্মকান্ডকে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, একই সঙ্গে দেখা হয় অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গেও। গণতান্ত্রিক কোনো দেশে রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা বা কর্মীকে গুম করা হবে এবং পরে এখানে-সেখানে, নদী ও খাল-বিলের পাশে তার লাশ পাওয়া যাবেÑ এমনটা কল্পনা করা যায় না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন হয়ে পড়া বাংলাদেশে গুম শুধু হচ্ছেই না, মাঝে-মধ্যে গুমের রীতিমতো ধুমও পড়ে যাচ্ছে। এজন্যই মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বেড়েছে ২৮৭ শতাংশ। এমন অবস্থা কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। সুতরাং সরকারকে তৎপর হতে হবে অনতিবিলম্বে।


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018