BdNewsEveryDay.com
Monday, June 17, 2019

নাদের আলী আমি আর কত বড় হবো?

Friday, January 11, 2019 - 838 hours ago

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। দেশের এক বন্ধুর সুবাদে পরিচয় হয় বিলেতে বেড়াতে আসা বাংলাদেশের এক বেশ বড়সড় আমলার সঙ্গে। তিনি অফিসের কাজে কয়েকদিন থাকবেন। উঠেছেন সেন্ট্রাল লন্ডনের একটি হোটেলে। একদিন বিকেলে আমাকে ফোন করলেন। আমিও বন্ধুর মান রক্ষায় তাকে পূর্ব লন্ডনে একসঙ্গে রাতের খাবারের আমন্ত্রণ জানাই। কিন্তু ওনার ব্যস্ততার কারণে সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে শুধু কফি খাওয়ার অনুরোধটুকু রক্ষা করলেন। পরদিন বিকেল ৫টায় তিনি পূর্ব লন্ডনের হুয়াইট চ্যাপেল স্টেশনে এসে হাজির হন। ওনাকে গাড়িতে উঠিয়ে গল্প করতে করতে ডকল্যান্ডে চলে আসি। থেমসের তীরঘেঁষে এখানকার কফি শপগুলো দারুণ। প্রায় প্রতিটি শপের বাইরেও বসার ব্যবস্থা চমৎকার। কফির কোয়ালিটিও ভালো, বোনাস হিসেবে থাকছে মনোরম দৃশ্য। তাই কফির সঙ্গে হালকা খাবারের অর্ডার দিয়ে বসে পড়লাম একটা ছাতার নিচে। সামার বলে কথা, রোদের তেজ তখনো কমেনি। কথা বলতে বলতে বুঝলাম ভদ্রলোক অসম্ভব দেশপ্রেমিক মানুষ। আর আমারও  বাংলাদেশ-ই হচ্ছে সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। বেশ ভালোই জমছে আড্ডা। যে পাশটায় আমরা বসেছি, তার পাশেই একটা সাইকেল রাখার জায়গা। কফিতে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ খেয়াল করলাম আমাদের পাশে এসে বেশ যতœ করে তার সাইকেলটায় তালা মারছেন তৎকালীন লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন। পরনে শর্টপ্যান্ট আর টি-শার্ট, বাতাসে তার উশকু-খুশকু চুল উড়ছে। আমি ভদ্রলোককে বললাম, আপনি কি তাকে চিনতে পারছেন? উনি তার দিকে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে বরিস সাইকেলটিকে নিরাপদে রেখে হাঁটা দিলেন। আমি বললাম, তিনি হচ্ছেন লন্ডনের মেয়র, উনি চিনতে পারলেন এবং কিছুটা অবাক হয়ে বোরিসের দিকে তাকিয়ে রইলেন। লন্ডনের মেয়র মানেই তো বিশাল ব্যাপার। ৪ জন মন্ত্রীর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাবান। লন্ডনের জনসংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ, জনসংখ্যার দিক থেকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় শহর। এই শহরে শতকরা ৪০ জন নাগরিক ভিনদেশি, যারা ৩০০টির বেশি ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি অনেকটা অবাক হয়ে বললেন, তার সঙ্গে তো কোনো নিরাপত্তারক্ষী নেই, কীভাবে সম্ভব? আমি একটু হেসেই বললাম, ওরা ব্রিটিশ জাতি, হিসাব-নিকাশ ওদের একদম ক্লিয়ার। এই লন্ডনে বোরিস জনসনের মতো কয়েক হাজার ভিভিআইপি রয়েছে। তাদের প্রত্যেককে যদি নিরাপত্তা দিতে যায় তাহলে সরকারের কী পরিমাণ পুলিশ লাগবে? তাই তারা পুরো শহরটাকে নিরাপদ করে ফেলেছে। কীভাবে? আপনি যদি লন্ডনের যে কোনো দিকে ১ ঘণ্টা হাঁটেন, তবে কমপক্ষে ১৭ বার আপনার ছবি তারা সংরক্ষণ করে। কারণ, লন্ডন শহরটি পুরোপুরি সিসিটিভির আওতায় রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সিসিটিভি এই শহরে। আর এসব সিসিটিভি পর্যবেক্ষণে আছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। প্রতি দশটি গাড়ির একটি গাড়ি কোনো না কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর। তাছাড়া শহরের চারদিকে ছড়িয়ে আছে কমিউনিটি পুলিশ। এখানে পুলিশ কোনো অস্ত্র বহন করতে পারে না বা তার প্রয়োজনও মনে করে না। ভদ্রতার দিক থেকে ব্রিটিশ পুলিশের রয়েছে বিশ্বব্যাপী সুনাম। ‘স্যার’ ছাড়া তারা সাধারণ মানুষকে সম্বোধন করে না। কারণ, তারা জানে তাদের বেতনের টাকাটা আসে এই সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আয় থেকে। যেকোনো পরিস্থিতিতে আপনি তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। বিনা কারণে গ্রেফতার এখানে এক গর্হিত অপরাধ। এখানে পুলিশ মানে বন্ধু। আপনার যেকোনো সমস্যায় তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে। আপনার নিরাপত্তাই  তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। পাশাপাশি নানান সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে আছে। তাই মানুষের কাছে পুলিশ এক নির্ভরতার জায়গা। কী রাত কী দিন, ২৪ ঘণ্টাই তাদের সেবা। এদেশের শিশুদের জীবনের প্রথম যে নম্বরটি মুখস্থ করতে হয় তা হলো ৯৯৯। পুলিশের কাছে সবাই সমান। তাই সব নাগরিকের জন্য তাদের দৃষ্টিও সমান। ফলে আপনি কখনোই কোনো ভিভিআইপিকে নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে চলতে দেখবেন না। তাছাড়া তারা তা পছন্দও করেন না। সমস্যা যে নেই তা নয়, নানা দেশের নানান মানুষ, নানান মত। তাই সমস্যাগুলো আরও জটিল, অপরাধের ধরনগুলোও ভিন্ন। এখানে কেউ কাউকে চেনে না, ফলে অপরাধীদের ধরাও অনেক সময় কঠিন কাজ হয়ে পড়ে। তাছাড়া বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের বিস্তারের কারণে লন্ডন হয়ে পড়ছে সন্ত্রাসীদের টার্গেট। যদিও তার আগে আইরিশ রিপাবলিকানদের মোকাবিলা করতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। ২০১৭ সালেই দুটি আক্রমণে অনেক মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটে। সবকিছু মিলে যেকোনো দুর্ঘটনা মোকাবিলায় তাদের রয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। কথার ফাঁকে বাংলাদেশের পুলিশ প্রসঙ্গটি চলে আসে। সেই হিসাবে বাংলাদেশের উন্নতিটা কোন পর্যায়ে আছে জানতে চাইলে তিনি হেসে ওঠেন। অথচ একটি জাতির একটি দেশ যা পৃথিবীতে বিরল। শতকরা ৯৮ জন বাঙালির আবাসস্থল এই বাংলাদেশ। ধর্মীয় বৈরিতা ছিল না বললেই চলে। এখানে সবাই সবাইকে চেনে, জানে। বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ে চেনা-জানার বিষয়টি একরকম সংস্কৃতির অংশ। তাই সাধারণ মানুষ এক ধরনের প্রাকৃতিক এবং সামাজিক নিরাপত্তায় বসবাস করে। দেশের সিংহভাগ মানুষের রয়েছে স্থায়ী ঠিকানা, যা পাশ্চাত্যে এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দেশে কোনো অপরাধীকে খুঁজে বের করা অনেক সহজ ব্যাপার। তাছাড়া সামাজিকভাবে নিজেদের মধ্যে সম্পর্কটা অনেক গভীর। অথচ শুধু রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে দেশটি আজ  বিভক্ত। এই বিভক্তি এসে পৌঁছে গেছে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যেদিকে তাকাই সেদিকেই বিভক্তি। আর এই বিভক্তির ফলে বেড়ে উঠছে একটি বিভ্রান্ত প্রজন্ম। যে প্রজন্মের অনেকেই জানছে না সঠিক ইতিহাস, দেখছে না সঠিক পথ। সেদিন আমার সেই অতিথি সান্তনার সুরে বলেছিলেনÑ হবে, আমাদেরও হবে, আরেকটু বড় হতে হবে। আজ স্বাধীনতার ৪৮ বছরে এসে সেই কথা বলতে ইচ্ছে করছেÑ নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো?


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018