BdNewsEveryDay.com
Monday, June 17, 2019

ব্যাংকিং খাতের গন্তব্য কোন দিকে

Friday, January 11, 2019 - 838 hours ago

ব্যাংকিং খাতের গন্তব্য কোন দিকে এইমাত্র আমরা নতুন একটি সম্ভাবনাময় বছরে পা রেখেছি। নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী নতুন সরকার দেশের নেতৃত্বে এসেছে। পারিবারিক জীবনে মানুষ নতুন বাসায় বসবাস শুরু করার আগে যেমন বাসাটি সাফসুতরা করে দোয়া-দরুদ পড়িয়ে যাত্রা শুরু করে, সরকারও তেমনি নিজেদের ভেতর কিছু রদবদল করে শপথবাক্য পাঠ করে যাত্রা শুরু করেছে। আমরা নতুন সরকারের কাছে অনেক কিছু আশা করি। সরকারের দায়িত্ব পালনকালীন এই পাঁচ বছরে আমরা মধ্য আয়ের দেশের সুবাতাস ভোগ করব। ২০২০ সালে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন করব। আমরা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলব। আর্থিক শিক্ষা কার্যক্রম দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেব। আর্থিক অন্তভভক্তির মাধ্যমে দেশের সব মানুষকে আর্থিক সেবার আওতায় এনে মানুষের জন্য একটি আর্থিক নিরাপত্তার ছাদ তৈরি করব। দেশের অর্থবাজারের নেতৃত্ব প্রদানকারী অনেকেই এ স্বপ্ন দেখেন। একসময় এসব স্বপ্নের পেছনে কিছু কাজও হয়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালে ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য কেমন ছিল, গতি-প্রকৃতি কেমন ছিল এবং হাল ধরা মাঝিদের দক্ষতাই বা কেমন ছিল, এসব বিচার-বিশ্লেষণ করে ২০১৯-এর সম্ভাবনা নিয়ে একটা ছক আঁকা যেতে পারে। ব্যাংকিং খাতের ২০১৮ শুরু হয় আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি পুরো ব্যাংকিং সেক্টরকে অস্থির করে তোলে। এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান সরাসরি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। এ ছাড়া ঋণ প্রদানে অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ ইত্যাদি কাজও ব্যাংকটিকে অসমর্থ করে তোলে। ফলে ব্যাংকের গ্রাহকরা একযোগে তাদের আমানত ফেরত চাইতে শুরু করেন এবং ব্যাংকটি একপর্যায়ে গভীর সমস্যায় নিপতিত হয়। ব্যাংক শব্দের অর্থ বিশ্বাস। কেউ যদি ব্যাংকের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তা হলে কোনো অবস্থাতেই তার টাকা ওই ব্যাংকে জমা রাখতে চাইবে না। আর ব্যাংকের রক্ষকরা নিজেরাই যদি ভক্ষকের ভূমিকায় নেমে পড়েন, তা হলে এই অবিশ্বাস আরও ত্বরান্বিত হবে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যাংক কর্তৃক গ্রাহকের আমানত ফিরিয়ে দিতে না পারায় ব্যাংকের পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলার খবর কম নেই। আমাদের দেশেও ইতিপূর্বে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ১৯৯২ সালে ব্যাপক অনিয়মের জন্য তারল্য সংকটে পড়ে। জনগণের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া এ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ করে দেয়। আমানতকারীদের আন্দোলনের মুখে সরকার বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক নামে একটি তফসিলি ব্যাংকে রূপান্তরিত করে নেয় প্রতিষ্ঠানটিকে। এ ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা অদ্যাবধি ভালো নয়। একই জোয়ারে ন্যাশনাল ক্রেডিট লিমিটেডের কার্যক্রমও স্থগিত হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেড নামে একটি তফসিলি ব্যাংক হিসেবে এটি আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশ ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের এই দুর্যোগ কাটিয়ে আবার ফিরে আসার জন্য সরকারের নির্দেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ এখানে আবার মূলধনের জোগান দেয়। ফলে ব্যাংকটি আবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধারে এবং অপরাধীদের বিচারের বিষয়ে তেমন উদ্যোগ দৃশ্যমান হচ্ছে না। ব্যাংকিং জগতের টাকা আত্মসাতের রেকর্ড সৃষ্টিকারী কলঙ্ক বলে বিবেচিত হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ অন্য কলঙ্কগুলোর ওপর প্রলেপ মেখে দৃষ্টির অন্তরালে রাখার প্রয়াসই লক্ষ করা গেছে। এসব টাকা আদায় এবং অপরাধীদের বিচারের উদাহরণ আমরা দেখতে পাই না। ২০১৭ সালের ৯ অক্টোবর আমাদের সময়ের উপসম্পাদকীয়তে ‘একটি বোকা দেশের কাহিনি, আর্থিক কেলেঙ্কারির জন্য ফাঁসি’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। এটি ছিল ভিয়েতনামের কাহিনি। সেখানে ওস্যান কমার্শিয়াল জয়েন্ট স্টক ব্যাংকের তহবিল তছরুপ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার অপরাধে এর চেয়ারম্যান হান ভান থামকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়। আর একই অপরাধে ব্যাংকের মহাপরিচালক সুয়েন সুন সনকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। আর্থিক কেলেঙ্কারির অপরাধে এ ধরনের কঠোর শাস্তি সে দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের লোভমুক্ত করতে পেরেছে এবং অন্য কোনো ব্যাংকে আর এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির খবর জানা যায়নি। আমাদের দেশে আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়ে অভিযুক্তরা শাস্তিমুক্ত থেকে সমাজে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াতে পারেন বলেই হয়তো বিভিন্ন ব্যাংকে এরূপ কেলেঙ্কারির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। আর বারবার সরকারি তহবিল থেকে, তা সরাসরি সরকারের বরাদ্দ থেকেই হোক বা সরকারি ব্যাংকের তহবিল প্রদানের মাধ্যমেই হোক, এদের পুঁজি পুনর্ভরণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও অপরাধীদের বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। সরকারের এই অর্থের মালিক অবশ্যই জনগণ। জনগণের করের টাকা এভাবে গুটিকয়েক মানুষ বারবার আত্মসাৎ করে নিয়ে যাচ্ছে, যা হওয়া উচিত ছিল না। ২০১৮ সালে অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্টের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে জনতা ব্যাংক। অ্যাননটেক্স গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে এখন আর তা আদায় করতে পারছে না ব্যাংকটি। ফলে এর অস্তিত্বে সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের সঙ্গেও আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে জনতা ব্যাংকের। এইগ্রুপের কাছে ঋণ খাতে পাওনা হয়েছে ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা, যা কোনোভাবেই আদায় হচ্ছে না। গ্রুপটির রফতানি খাতে ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা বিদেশে আটকা পড়েছে। এ টাকার বিপরীতে ব্যাংক গ্রুপটিকে ঋণ দিয়েছিল, যা আদায় করা যাচ্ছে না। তা ছাড়া এই রপ্তানির বিপরীতে সরকারের রফতানি সহায়তা প্রোগ্রামের আওতায় ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা ব্যাংকটির মাধ্যমে ক্রিসেন্ট গ্রুপ আত্মসাৎ করেছে। সব মিলিয়ে ক্রিসেন্ট গ্রুপের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। এসব টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ বা আইনি ব্যবস্থার তেমন লক্ষণ লক্ষণীয় নয়। হয়তো অতীতের মতোই একসময় জনগণের টাকা দিয়ে ব্যাংকটির পুঁজি ঘাটতির মোকাবিলা করা হবে এবং ব্যাংক নতুন করে আবার ঋণ কেলেঙ্কারি চালিয়ে যাবে। আর অন্যদিকে বিচারের বাণী যথারীতি উচ্ছিষ্টের মতো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে থাকবে। ব্যাংকিং খাতে ২০১৮ সালের আর একটি আলোচ্য বিষয় হলো, তারল্য সংকট মোকাবিলায় কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ। ব্যাংকগুলোয় সৃষ্ট তারল্য সংকট কৃত্রিম কিনা তা নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে এবং ব্যাংকে ঋণের সুদহার আবারও কমবেশি শতকরা ১৬তে গিয়ে পৌঁছাল, তখন প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেন সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে। বিভিন্ন সেবার জন্য ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ওপর বিভিন্ন হারে কমিশন আদায় করে থাকে। একসময় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়যোগ্য কমিশন ও সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করে দেওয়া হতো। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের নির্দেশনা না থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের ইচ্ছা অনুসারে উঁচু হারে কমিশন ও সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করে। গ্রাহকের স্বার্থে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। ঋণ বিতরণ, আদায়, খেলাপি কমিয়ে আনাসহ অন্যান্য বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান নয়। বছর বছর খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে। ২০১৮ সালের সমাপনান্তে এর পরিমাণ লক্ষাধিক কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমান সময়ে কেবল অন্য ব্যাংকের লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে সক্ষম হচ্ছে। তালিকাভুক্ত এবং অতালিকাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের দক্ষতা বেশ ভালো। দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্য ব্যাংকগুলোকে এ সেবা দিয়ে একটি পরসেবার উদাহরণ সৃষ্টি করতে পেরেছেন। নিয়োগ, পরীক্ষা ও অন্যান্য বিষয়াদি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নামে পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়মিত বিজ্ঞাপনগুলো দেখে যে কোনো লোক ভুল করতে পারে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কাজ বুঝি বা বাণিজ্যিক ব্যাংকের লোক বাছাই করে দেওয়া। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর কোনো অধ্যায়েই বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য লোক নিয়োগ করে দেওয়ার বিধান বিধৃত করা হয়নি।


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018