BdNewsEveryDay.com
Friday, January 18, 2019

ম্যাজিক চমক ও চ্যালেঞ্জের মন্ত্রিসভা

Friday, January 11, 2019 - 159 hours ago

ম্যাজিক চমক ও চ্যালেঞ্জের মন্ত্রিসভা কারো প্রতি রাগ-বিরাগের বশবর্তী না হওয়াসহ প্রকাশ্য ও গোপনীয় শপথের মধ্য দিয়ে শুরু হলো শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভার পথচলা। এ শপথের মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলেন তিনি। শপথ নেওয়ার এক দিন আগে, আনুষ্ঠানিকভাবে শপথের ডাক পাওয়া মন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করাও চমক হিসেবে নতুন। এমন আগাম ঘোষণা একেবারেই নতুন সংস্কৃতি। সংখ্যায় তারা ৪৭। পূর্ণমন্ত্রী ২৪ জন। ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী। আর উপমন্ত্রী ৩ জন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ছয়টি মন্ত্রণালয় রাখাও একটি ঘটনা। এগুলো হলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বঙ্গভবনে ঘটা আয়োজনে শপথ নিলেন শেখ হাসিনাসহ তার নয়া মন্ত্রিসভার ৪৭ সদস্য। সংবিধানের রক্ষণ-সংরক্ষণের শপথবদ্ধও হলেন তারা। এবারের নির্বাচনকে বলা হচ্ছিল শেখ হাসিনার ম্যাজিক। সেই বিবেচনায় মন্ত্রিসভাকে চমক বলা ছাড়া আপাতত শব্দ না খোঁজাই উত্তম। দলীয় ভাষ্য হচ্ছে : নতুন মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী সৎ এবং নিষ্ঠাবানদের খুঁজেছেন। আর সাদামাটা চোখে মানুষ দেখছে তিনি বাদ দিয়েছেন দলের হেভিওয়েটদের। তরুণদের বেশি পরিমাণে ঠাঁই দিয়েছেন। তারা মন্ত্রিত্বের তেজ-ঝাঁজ সইতে পারবেন কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্র্রশ্নদৃষ্টে রয়েছে উদাহরণসহ উচিত জবাবও। আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, নুরুল ইসলাম নাহিদ, শাজাহান খানের মতো নেতারা বাদ পড়বেন বলে ধারণা করা যায়নি। বাদের খাতায় অন্যতম হেভিওয়েট বেগম মতিয়া চৌধুরীর নাম কেউ ভুলেও ভাবেনি। এটিও বিশাল চমক। মহাজোটগতভাবে জিতে শতভাগ আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা গঠনও একটি চমক। এর আগে-পিছে শেখ হাসিনার মহা অঙ্কের ধারণা অনেকের। এ ছাড়া মন্ত্রিসভা থেকে কিছু চেহারা বাদ পড়ার কারণে-অকারণে কারো কারো ভালো লাগছে। এবারের সংসদে প্রধানমন্ত্রীর স্বজন এবং শেখ পরিবারের সদস্য জিতে এসেছেন ডজনের মতো। কিন্তু তাদের কারো ভাগ্যেই মন্ত্রিত্ব জোটেনি। বিগত কেবিনেটেও ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। প্রথম দফায় তিনি ছিলেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী। দ্বিতীয় মেয়াদে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সরিয়ে তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এবার মন্ত্রিসভায় তাকে বাদ দেওয়াটাকে অনেকে বলছেন অবিশ্বাস্য। একই সঙ্গে তৃতীয় বারের মতো মন্ত্রিত্ব বঞ্চিত হলেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ১৯৯৬ সালে প্রথম মেয়াদে শেখ সেলিম ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। চমকের সঙ্গে এবারের  কেবিনেট গঠনে বিস্ময়ের ঘটনাও রয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর রাজনীতির ময়দানে তুলনামূলক অপরিচিত কুমিল্লা লাকসামের তাজুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী করা। এ মন্ত্রণালয় সাধারণত দলের সাধারণ সম্পাদককে দেওয়া হয়। কিন্তু সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সরিয়ে ঐ পদে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফকে দিয়ে শেখ হাসিনাই প্রথাভঙ্গ করেছিলেন। প্রথাভঙ্গের ধারায় এবার চমকের ওপর চমক। বাণিজ্যের মতো স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন মুখ টিপু মুনশিকে। একজন ব্যবসায়ীকে ব্যবসায় সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ে দেওয়া মেরুকরণের সঙ্গে কম চ্যালেঞ্জের নয়। জীবনে প্রথম এমপি হয়েই মন্ত্রী হলেন শ ম রেজাউল। তাকে দেওয়া হয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তিনি এ রকম একটি দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রণালয়ের চাপ কীভাবে সামলাবেন সেটাও অপেক্ষা করে দেখার বিষয়। পরিষদে ব্যবসায়ীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় সম্ভাবনা-সমস্যা দুটিই দেখছেন কেউ কেউ। অর্থ, বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ছিলেন। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীও বড় ব্যবসায়ী। গাজী গ্রুপের চেয়ারম্যান। এ গ্রুপটি উৎপাদন, আবাসন, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ব্যবসার শীর্ষে। শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদারও দেশের নামকরা ব্যবসায়ী। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহাব) সাবেক সভাপতি। তিনি গত পাঁচ বছর একই মন্ত্রণালয়ে ছিলেন এবং আছেন। বাদ পড়াদের নিয়ে সমালোচনা তেমন নেই। তবে আলোচনা চলছে তাদের বাদ পড়ার রহস্য নিয়ে। তাদের মধ্যে কয়েকজন টানা আর কয়েকজন সময়ে সময়ে বিতর্কিত। বেশি সমালোচিত-বিতর্কিত শাজাহান খান। নৌমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এই শ্রমিক নেতা নানা কারণে সমলোচিত হয়েছেন বিগত সরকারের আমলে। বিতর্কিত ভূমিকার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়ক খাতে কোনো কিছু হলেই আলোচনায় আসে পরিবহন খাতের নেতা ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নাম। সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় হেসে কথা বলায় তিনি দেশজুড়ে সমলোচনার মুখে পড়েন। এরপর আসে ধর্মমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নাম। ধর্মমন্ত্রী থাকাকালে হজ নিয়ে নানা সময়ে তিনি বিতর্কিত হয়েছেন। সমলোচিত ছিলেন আত্মীয়-স্বজনের অপ্রিয় কর্মকা-ের জন্যও। আরেকজন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। পুত্রদের ও কন্যার জামাতাকে ঘিরে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণের দায়িত্বে থাকা এই মন্ত্রীর। আওয়ামী লীগের শুরু হওয়া ১৯৯৬ সালে শাসনকালের মেয়াদে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে বড় ছেলে দীপু চৌধুরীকে ঘিরে নানা কাহিনি তাকে বিব্রত করেছিল। বিদায়ী রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক সমালোচনার পাশাপাশি রসালোচনায়ও ছিলেন। বুড়ো বয়সে বিয়ে, যমজ বাচ্চা জন্ম দেওয়াসহ ব্যক্তিগত কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে তাকে নিয়ে রসঘন আলোচনা ছিল। তবে বেশি সমালোচিত ছিলেন রেলের দুর্ভোগ নিয়ে। রেলওয়ে যা আয় করেছে তার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। টুকটাক দুর্নীতি ও কিছু খুচরা অনিয়মের বদনামও ছিল তাকে নিয়ে। বাদ পড়া আরেকজন শামসুর রহমান ডিলু। একদিকে বয়সের ভার, অন্যদিকে পরিবারে বিরোধ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের পাশাপাশি ও দলীয় কর্মীদের অবমূল্যায়নের অভিযোগও উঠেছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ডিলুর বিরুদ্ধে। ব্যর্থতা বা অভিযোগ না থাকার পরও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পাওয়াদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী। ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে কৃষিমন্ত্রী হিসেবে নিষ্ঠাবান এবং সৎ মন্ত্রী হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। কিন্তু তবু তার বাদ পড়াটাও এবারের চমক। প্রায় কাছাকাছি অবস্থা আসাদুজ্জামান নূরের। আসাদুজ্জামান নূর দশম জাতীয় সংসদে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয় এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মন্ত্রী হিসেবেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সর্বশেষ মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন মির্জা আজম। বেশ বিচক্ষণতার সঙ্গেই তিনি কাজ সামলেছেন। তেমন দুর্নাম শোনা যায়নি। দশম জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ইসমত আরা সাদেক। ব্যক্তিগতভাবে তিনি প্রয়াত শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেকের স্ত্রী। অনেকটা অচেনার মতো তিনিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকেই তার দায়িত্ব পালন করেছেন। বাদ পড়াদের আরেকজন নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মেহের আফরোজ চুমকি। তিনিও বেশ দক্ষতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে নিয়ে কোনো বিতর্ক না থাকলেও এবারের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন তিনি। এর আগে নবম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভায় থাকলেও দশম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া ৪ জনকে এবার ফিরিয়ে আনাও একপশলা চমক। তারা হলেন ডা. দীপু মনি, ড. হাছান মাহমুদ, ড. মো. আবদুর রাজ্জাক ও মুন্নুজান সুফিয়ান। ডা. দীপু মনি নবম জাতীয় সংসদে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। এবার পেলেন শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব। ড. রাজ্জাক নবম জাতীয় সংসদে খাদ্য মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। গেলবার মন্ত্রিত্ব জোটেনি। এবার পেলেন কৃষি মন্ত্রণালয়। এদিকে ড. হাছান মাহমুদ নবম জাতীয় সংসদে ২০০৮ থেকে ৩১ জুলাই ২০০৯ পর্যন্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর পর গত দশম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভায় তারও মন্ত্রিত্ব ছিল না। এবার তিনি তথ্যমন্ত্রী। বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান নবম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনিও গত মন্ত্রিসভায় ছিলেন না। এবার আবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। নানা ম্যাজিক ও চমকের সঙ্গে এমন মন্ত্রিসভা গঠনে শেখ হাসিনা কিছু ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ আলিঙ্গন করলেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারো কারো মতে, বয়স ও অভিজ্ঞতা বিচারে ২০০৮ সালের চেয়েও এবারের কেবিনেট আনকোরা। এমন ধারণা বা মূল্যায়নের যুক্তি হয়তো রয়েছে। এর বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী যে সাহসের প্রমাণ দিলেন সেটা এরই মধ্যে প্রমাণিত। চ্যালেঞ্জ জয় ও চমক তৈরির প্রশ্নে তাকে নিয়ে কিছু মিথ তৈরি হয়েছে। বলা হয়ে থাকে তিনিই পারেন, তিনিই পারবেন। এর পরও বাকিটা অপেক্ষা করে দেখার বিষয়।


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018