BdNewsEveryDay.com
Monday, November 19, 2018

সড়ক দুর্ঘটনারোধে চালকসহ যানবাহনের ফিটনেস সনদ জরুরি

Thursday, November 08, 2018 - 273 hours ago

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান : দেশের জনসংখ্যা ষোলকোটি আশিলাখে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষের যাতায়াত ও মালামালের পরিবহন ও যানবাহনের মাত্রা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে জানা যায় দেশে ৫০ লাখের বেশী পরিবহন চলাচল করছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বি.আর.টি এর তথ্য মতে বর্তমানে সারাদেশে বাস, মিনিবাস ও হিউম্যান হলারসহ মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার ১৮৯টি। বেসরকারী হিসাবে সারা দেশে যানবাহনের চালকের সংখ্যা ৭০ লাখের বেশী। এসব চালকের মধ্যে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বি.আর.টি এর তথ্য মতে বর্তমানে সারাদেশে অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৮১৬ জন। যার মধ্যে পেশাদার চালক ৮ লাখ ৩০ হাজার ৯০ জন। অপেশাদার চালকের সংখ্যা ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৬ জন। অবশিষ্ট সাড়ে ৫১ লাখ অবৈধ ও অদক্ষ হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক জরিপে দেখা গেছে বিআরটিএর নিবন্ধিত মোট পরিবহনের ৪০ শতাংশই ফিটনেসবিহীন। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ৫০ লাখ যানবাহনের মধ্যে মাত্র ৩৫ লাখ যানবাহনের নিবদ্ধন রয়েছে, বাকী ১৫ লাখের কোন সনদ নেই। আইন অনুযায়ী যেসব যানবাহনের রেজিস্টেশন নেই, সেগুলোর ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই। উল্লেখ্য ফিটনেস সার্টিফিকেট পেতে হলে যানবাহন সহ বিআরটিএ অফিসে হাজির হয়ে অন্তত ৩০ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। যে কারণে বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির শেষ নেই চালক ও গাড়ির মালিকের। সেই সাথে দীর্ঘ সূত্রতা তো রয়েছেই। বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন অথরিটি ২০টি ক্যাটাগরিতে পরিবহনের লাইসেন্স দিচ্ছে। এই ক্যাটাগরিগুলোর মধ্যে প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৮২ সাল থেকে চলতি বছরের ৩১ জুন পর্যন্ত ৫ হাজার ৪১৮টি অ্যাম্বুলেন্স, ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০টি অটোরিকশা, ২০ হাজার ৪৭৩টি অটো-টেম্পু, ৪৫ হাজার ৩৭৭টি বাস, ৯ হাজার ৩২৯টি কার্গো ভ্যান, ২৮ হাজার ৪৭০টি কার্ভাড ভ্যান ২৮ হাজার ৪২৯টি ডেলিভারী ভ্যান, ১৮ হাজার ২৫টি হিউম্যান হলার, ৫৫ হাজার ৮৬৩টি জিপ, ৯৯ হাজার ১৮৭টি মাইক্রোবাস, ২৮ হাজার ৬৩টি মিনিবাস, ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৯২ মোটরসাইকেল, ১ লাখ ৮ হাজার ৬৯০টি ফিক-আপ (ডাবল/ সিঙ্গেল কেবিন), ৩ লাখ ৪০ হাজার ২৮৯টি প্রাইভেট প্যাসেঞ্জারকার, ৯ হাজার ৮৭১টি স্পেশাল পারপোস ভ্যাহিক্যাল, ৫ হাজার ৬০টি ট্যাঙ্কার, ৪৫ হাজার ২৯৫টি ট্যাক্সিক্যাব, ৪১ হাজার ৬০৬টি ট্রাক্টর, ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪১০টি ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহন রয়েছে ১৭ হাজার ৮০৩টি। দেশে বেকার সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। এদের মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বেকার চাকুরীর আশায় সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও চাকরী না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন। আজকাল দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করে দেশের হাজার হাজার যুব-যুবার প্রতারণার শিকারে সর্বশান্ত হয়ে পড়েছে। বেকারত্বের অভিশাপে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে প্রায় দুইকোটি বেকার মানসিক রোগে আসক্ত হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক বেকার যুবক ১ থেকে দেড় লাখ টাকায় কেনা ইজিবাইক চালিয়ে যখন ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, তখন সরকারীভাবে শহরের প্রধান প্রধান সড়কে ইজিবাইক চালানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় নতুন করে বিপাকে পড়তে হয়েছে ইজিবাইক চালকদের। আইনের দোহাই দিয়ে এক শ্রেণীর হাইওয়ে পুলিশ হাতিয়ে নিচ্ছে মাসোয়ারা কিংবা দৈনিক চাঁদা বা জরিমানা। সমিতি, ইউনিয়ন, ফেডারেশন সহ বিভিন্ন নামে বে নামের এক শ্রেণীর কর্মী বাহিনী প্রতিটি ইজিবাইকের চালকদের নিকট থেকে দৈনিক পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে। এ টাকার একটি অংশ চলে যায় হাইওয়ে পুলিশের পকেটে,এছাড়া এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিক সহ গডফাদারদের পকেটে।বাদ বাকী টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় চাঁদা আদায় কারী নেতা ও কর্মীদের মাঝে,এমনটাই জানালেন ইজিবাইক চালকদের অনেকেই। দেশের প্রতিটি উপজেলার চিত্র প্রায় একই রকম। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর এবং পূর্বাঞ্চলের জামালপুর, টাঙ্গাইল, শেরপুর, ময়মনসিংহ জেলা গুলোর উপজেলাসমূহে ইজিবাইকের চলাচল বেশী। নদী সিকস্তি দারিদ্র্যতার শিকার বেকারদের জীবন-যাপনের শেষ অবলম্বন ইজিবাইক চালক। এক সময় পা দিয়ে রিক্সা চালানোতে লজ্জা পেলেও এখন ইজিবাইক বা অটোরিক্সা চালাতে কোন লজ্জা বোধ করছে না উচ্চশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং সাধারণ অশিক্ষিত হাজার হাজার বেকার যুবকেরা চাকরীর আশায় দারে দারে ঘুরে সর্বশান্ত হয়ে অথবা চাকরী থেকে অবসর গ্রহণ করে পরিবার পরিজন নিয়ে বাঁচার তাগিদে শেষ অবলম্বন হিসাবে ইজিবাইকের চালক হিসেবে ইতোমধ্যে অনেকেই আত্মকর্মসংস্থানের উত্তম মাধ্যম হিসাবে বেশ সাচ্ছন্দবোধ করছেন। রুটিরুজির পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচ বহন করছেন। এদের অনেকেই বিয়ে করে এককালীন অর্থযুগিয়ে ইজিবাইক কিনেছেন। আবার কেউ কেউ ঋণ করে টাকা জোগার করে ইজিবাইক ক্রয় করেছেন। কেউ কেউ ব্যবসা, চাকরি বাদ দিয়ে অথবা অবসর গ্রহণ করার পর ইজিবাইক চালিয়ে রোজগারে নেমেছেন। কেউ কেউ অন্য পেশার পাশাপাশি অবসরে ইজিবাইকের ড্রাইভারীকে বাড়তি রোজগারের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ইজিবাইকের চালকদের মধ্যে দৈনিক ৫শ থেকে দুহাজার পর্যন্ত দৈনিক আয় করে থাকেন। সর্বপরি ইজিবাইক ইজিলাইফে পরিণত হয়েছে। দেশের সরকার যেহেতু ট্রাক্স আদায়ের মাধ্যমে চায়না থেকে ইজিবাইক আমদানী অব্যাহত রেখেছে, সেহেতু এসব ইজিবাইক চলাচলের বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। আমদানীকৃত এসব ইজিবাইক শব্দ দূষণ ও বায়ুদূষণ থেকে মুক্ত, জ¦ালানি খরচ নেই। যাতায়াতের জন্য ইজিবাইকের রাস্তার ব্যাসার্ধ কম লাগে। যেহেতু বিদেশ থেকে ইজিবাইক আমদানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সেহেতু দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থবিনিয়োগ করে আমদানি করতে হয়েছে। এসব ইজিবাইক জাদুঘরে কিংবা বাসা-বাড়িতে সাজিয়ে রাখার জিনিস নয়। ইজিবাইকের মাধ্যমে অজোপাড়া গাঁয়ের যাত্রীদের দিবা-রাত্রী খুব কম খরচে কম সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের, চাকরীজীবিদের, পেশাজীবিদের সহ রেল, বাস, লঞ্চ ও বিমান বন্দরের দূরপাল্লার যাত্রীদের নিরাপদে দ্রুত কম খরচে যাতায়াতের সুবিধা দিয়ে থাকে ইজিবাইক। এক্ষেত্রে বলা যায় যে ইজিবাইক নামকরণটি যথার্থ হয়েছে। সম্প্রতি দেশের প্রধান প্রধান সড়কে ইজিবাইক চলাচলে সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বাঁধা নিষেধ আরোপ করছে। শহরের প্রধান প্রধান সড়কে ধর পাকরের কারণে নানা দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে ইজিবাইক চালক ও যাত্রী সাধারণের। ফলে ইজিবাইক ইজিলাইফ কর্মসংস্থান বন্ধের উপক্রম হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশের কয়েক লক্ষাধিক ইজিবাইক চালকদের জীবনের উপর আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর আক্রমণ বজ্রপাতের মতো শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা আইনের দোহাই দিয়ে ইজিবাইকের চাকাগুলো ফুটো করার পাশাপাশি এখন কেটে দিচ্ছেন। এতে ইজিবাইকের চালকদের তিনটি চাকা ক্রয় করতে গিয়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেহুদা ব্যয় করতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। অনেকে এই টাকা জোগার করতে না পেরে ইজিবাইক মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে বাইকের ব্যাটারী অকার্যকর হয়ে পড়ায় গাড়িগুলো অচল হয়ে পড়ছে, সেই সাথে বাইকের চালকরা বেকার হয়ে পরায় পরিবারে বাড়ছে ভোগান্তি ও অশান্তি। ভুক্তভোগীদের মধ্যে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য দু-কলম লেখার জন্য অনেকদিন ধরেই অনুরোধ জানিয়ে আসছেন। যাতে করে প্রতিদিন হাইওয়ে পুলিশ কর্তৃক ইজিবাইক চালকদের হয়রানির শিকার হতে না হ। আমাদের একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ইজিবাইকের চালকরা এদেশেরই নাগরিক। তাদের ও পেশা বেঁছে নিয়ে কর্ম করে রোজগার করে জীবন-জীবিকার অধিকার রয়েছে। সরকারও চায় বেকারমুক্ত বাংলাদেশ, স্বনির্ভর ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জ থেকে নাটোরের বনপাড়া পর্যন্ত মহাসড়কের পাশে যেভাবে ইজিবাইক সহ ছোট ছোট যানবাহন ও যাত্রী পরিবহনের জন্য পাশ্ববর্তি সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে সেভাবে দেশের মহানগর, জেলা, উপজেলায় জনবহুল মহাসড়কের দু-পাশে একফুট নিচু করে ইজিবাইকের যাতায়াতের জন্য রাস্তা নির্মাণ করা হলে নিরাপদে যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলে কোন অসুবিধা হবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের যাত্রীদের যাত্রা বিরতিহীন কম সময়ে কম খরচে শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, রেলস্টেশন, বাসস্টেশন, লঞ্চ ঘাট, বিমান বন্দরে অনায়াসে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিমূলক দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে নিয়েছে। কাজেই তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করা সরকারের দায়িত্ব। এতে হাইওয়ে পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব পালনেও সহায়ক হবে এবং ইজিবাইক থামিয়ে চাঁদা বাজি করার কারণে সৃষ্ট যানজটও নিরশন হবে। ইজিবাইকের লাইসেন্সের ব্যবস্থা গ্রহণে কার্যকরী ক্ষমতা যেহেতু বিআরটিএর হাতে সেহেতু সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করে এগুলো চলাচলের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এক্ষেত্রে দেশের সরকারকে গভীরভাবে ভেবে চিন্তে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করা উচিত নয়। এ বিষয়ে কালক্ষেপণ মানেই পরিবহন সেক্টরে সংকট সৃষ্টি অপরদিকে কর্মসংস্থান গ্রহণকারী বেকার যুবকদের মাথায় বজ্রপাত সমতূল্য। আশা করি সরকার এসব বিষয়ে গুরুত্বের সাথে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়ার প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করবেন। এমনটাই দাবি অভিজ্ঞ মহলের। লেখক: জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক সাংবাদিক ও উন্নয়ন কর্মী। ইমেইল: dr.mizanur470@gmail.com


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018