BdNewsEveryDay.com
Monday, December 10, 2018

সূরা সাবা: আয়াত ১-৫ (পর্ব-১)

Thursday, October 11, 2018 - 838 hours ago

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা সাবার ১ থেকে ৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এই সূরায় সাবা জাতির ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।  এই সূরার প্রথম দুই আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَلَهُ الْحَمْدُ فِي الْآَخِرَةِ وَهُوَ الْحَكِيمُ الْخَبِيرُ (1) يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ الرَّحِيمُ الْغَفُورُ (2)

“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি নভোমণ্ডলে যা আছে এবং ভূমন্ডলে যা আছে সব কিছুর মালিক এবং তাঁরই প্রশংসা পরকালে। তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।” (৩৪:১)

“যা ভূগর্ভে প্রবেশ করে, সেখান থেকে যা নির্গত হয়, যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় এবং যা আকাশে উত্থিত হয় (তার সবকিছু) তিনি জানেন। তিনি পরম দয়ালু ক্ষমাশীল।” (৩৪:২)   

গাছ-গাছালি, পাহাড়, জঙ্গল, নদী ও সাগরসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত যেকোনো চিত্রাঙ্কন দেখলে আমরা অভিভূত হয়ে যাই এবং নিজেদের অজান্তেই যে ব্যক্তি এটি এঁকেছে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হই। এখান থেকে আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন, শুধু বিদ্যমান দৃশ্য অঙ্কণকারী যদি এতটা প্রশংসা পেতে পারে তাহলে এই সুন্দর আকাশ ও প্রকৃতি যিনি সৃষ্টি করেছেন সেই স্রষ্টা কতখানি প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখেন।

পবিত্র কুরআনের পাঁচটি সূরা আল্লাহ তায়ালার প্রশংসাসূচক আয়াত দিয়ে শুরু হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট হচ্ছে সূরা হামদ যা আমরা প্রতিদিন নামাজে তেলাওয়াত করি। এ ধরনের আরেকটি সূরা হচ্ছে সূরা সাবা যেখানে এই সুন্দর পৃথিবী সৃষ্টি করার জন্য মহান আল্লাহর প্রশংসা করা হয়েছে।  যিনি কোনো কিছু অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে সৃষ্টি করেন তিনি তার ভেতরের সব খবর জানেন। তিনি নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে সেই সৃষ্টি পরিচালনা করেন। আখেরাতেও জান্নাতবাসীরা মহান আল্লাহর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে। কারণ, সেদিন আল্লাহ তায়ালা তাদের সঙ্গে ন্যায়বিচার করেছেন এবং সৎকর্মশীলদের মহাপুরস্কার দান করেছেন।

এ দুই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হলো:

১. প্রকৃতপক্ষে সকল প্রশংসা আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়। আমরা যখন ভালো কাজের জন্য কারো প্রশংসা করি তখন আসলে তার স্রষ্টারই প্রশংসা করা হয়।

২. মানুষ ও সৃষ্টিজগত সম্পর্কে আল্লাহর জ্ঞান ভাসা ভাসা নয়; বরং তিনি এসব সৃষ্টির অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়েরও জ্ঞান রাখেন।

সূরা সাবা’র ৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَأْتِينَا السَّاعَةُ قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتَأْتِيَنَّكُمْ عَالِمِ الْغَيْبِ لَا يَعْزُبُ عَنْهُ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَلَا أَصْغَرُ مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْبَرُ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ (3)

“কাফেররা বলে আমাদের উপর (কখনো) কেয়ামত আসবে না। বলুন, কেন আসবে না? আমার পালনকর্তার শপথ-অবশ্যই আসবে। তিনি অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত। নভোমন্ডলে ও ভূ-মন্ডলে তাঁর আগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিছু, না তদপেক্ষা ক্ষুদ্র এবং না বৃহৎ; সমস্তই সুস্পষ্ট কিতাবে (লিপিবদ্ধ) আছে।” (৩৪:৩)   

যারা এক আল্লাহতে বিশ্বাস করে না এবং স্রষ্টা হিসেবে তাঁকে অস্বীকার করে তারা স্বাভাবিকভাবেই কিয়ামতে বিশ্বাসী নয়। তারা মৃত্যুর পর মানুষের পুনরুজ্জীবন এবং কিয়ামতের বিচার দিবসকে অস্বীকার করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহর নবী (সা.) সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, এটা কাফেরদের অনুমান ও মিছে আশা যে, মৃত্যুর পর কিয়ামত সংঘটিত হবে না। এই অলীক কল্পনার কারণে তারা মনে করে দুনিয়াতে তারা যা খুশি তাই করতে পারে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে যে ঐশী বাণী গ্রহণ করেন তাতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে মুমিন ও কাফির উভয় ধরনের মানুষকে হাজির করা হবে এবং সেদিন তাদেরকে দুনিয়ার জীবনের সব কর্মকাণ্ডের হিসাব দিতে হবে। পার্থিব জীবনে মানুষের সঙ্গে নিয়োজিত ফেরেশতাদের লিপিবদ্ধ করা আমলনামার ভিত্তিতে সেদিন বিচার করা হবে। সেদিন প্রতিটি মানুষের সঙ্গে ন্যায়বিচার করা হবে এবং তাদের ছোট-বড় কোনো আমলই বাদ দেয়া হবে না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কিয়ামতে অবিশ্বাসকারীদের কাছে তাদের ধারণা প্রমাণ করার কোনো দলিল নেই। তারা শুধু অলীক কল্পনায় ডুবে রয়েছে।

২. মানুষকে সেই আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে যিনি তার গোপন ও প্রকাশ্য সব খবর রাখেন এবং তার কাছে লুকানোর কিছু নেই।

এবং

৩. পার্থিব জীবনে পুরস্কার পাওয়ার জন্য কাজের পরিমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু কিয়ামতের দিন কাজের পরিমাণ নয় বরং গুণগত মান এবং কাজের প্রতি একনিষ্ঠতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে।

এই সূরার ৪ ও ৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

لِيَجْزِيَ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ (4) وَالَّذِينَ سَعَوْا فِي آَيَاتِنَا مُعَاجِزِينَ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مِنْ رِجْزٍ أَلِيمٌ (5)

“তিনি পরিণামে যারা মুমিন ও সৎকর্ম পরায়ণ, তাদেরকে প্রতিদান দেবেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।” (৩৪:৪)

“আর যারা আমার আয়াত সমূহকে (অস্বীকার করার মাধ্যমে) আমাকে ব্যর্থ করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়, তাদের জন্যে রয়েছে (কঠিন) শাস্তি ও যন্ত্রণাদায়ক পরিণাম।” (৩৪:৫)    

আগের আয়াতে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা বলার পর এই আয়াতে মানুষের চূড়ান্ত পরিণাম সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিন মানুষ দু’টি ভাগে বিভক্ত হবে। একদল হবেন জান্নাতবাসী যারা পার্থিব জীবনে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার হিসেবে আল্লাহর কাছ থেকে সম্মানজনক জীবিকা অর্জন করবেন। অন্যদল হবে জাহান্নামবাসী যারা কুরআনের বাণী ও শিক্ষাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। তারা ভেবেছিল, তারা আল্লাহর তায়ালার পাকড়াও থেকে বাঁচতে পারবে এবং মহান স্রষ্টাকে ব্যর্থ করে দেবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তারা তাদের কল্পনার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থায় পতিত হবে।

এই দুই আয়াতের তিনটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. কিয়ামতের দিন আল্লাহর তায়ালার কাছ থেকে পুরস্কার লাভের একমাত্র উপায় হচ্ছে পার্থিব জীবনে তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও সৎকর্ম সম্পাদন।

২. তাঁর পক্ষেই মানুষকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিদান দেয়া সম্ভব যিনি মানুষের সব কাজ ও কাজের প্রতি তার একনিষ্ঠা ও আগ্রহ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।

৩. পবিত্র কুরআন ও দ্বীন ইসলামকে দুর্বল করার জন্য শত্রুদের প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে উদাসীন থাকলে চলবে না। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, একদল মানুষ আছে যারা সবাইকে পবিত্র কুরআনের আয়াত ও শিক্ষা থেকে সব সময় দূরে রাখতে চায়। তাদের ব্যাপারে আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে।# 

 


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018