BdNewsEveryDay.com
Sunday, November 18, 2018

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গ

Friday, September 14, 2018 - 838 hours ago

ক্ষমতাসীনদের বদৌলতে বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি-জালিয়াতি এবং অর্থপাচার ও অর্থআত্মসাতের মতো অসংখ্য ঘটনা নিয়ে দেশে-বিদেশে হৈচৈ পড়ে যাওয়ায় ধারণা করা হয়েছিল, সরকার নিশ্চয়ই সতর্ক হবে এবং পরিস্থিতিতে শুভ ও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে। অন্যদিকে বাস্তবে কোনো একটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন তো ঘটেইনি, বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির বরং ভীতিকর অবনতি ঘটেছে। লাফিয়ে বেড়ে চলা দুর্নীতির পাশাপাশি একদিকে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ, অন্যদিকে অবিশ্বাস্য হারে বেড়েছে ঋণখেলাপি কোটিপতিদের সংখ্যাও। চলতি বছর ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত কোটিপতিদের সংখ্যা দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮-তে পৌঁছেছে। এ সময়ে ঋণখেলাপিদের কাছে আটকা পড়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। 

খেলাপি ঋণ এবং ঋণখেলাপি কোটিপতিদের সম্পর্কিত তথ্যগুলো জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত বুধবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী লিখিতভাবে একশ’জন শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকাও পেশ করেছেন। এতে দেখা গেছে, ওই একশ’ জনের মধ্যে বর্তমান সংসদের দু’জন এমপির নাম রয়েছে। একজন রাজধানীর মিরপুর এলাকার এবং দ্বিতীয়জন রাজশাহীর। বিস্ময়কর তথ্যটি হলো, ঘটনাক্রমে দু’জন এমপিই ক্ষমতাসীন দলের এবং দু’জনই ‘পাওয়ার’ তথা বিদুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অর্থমন্ত্রীর বিবৃতিতে এমন ব্যবসায়ী গ্রুপের নামও রয়েছে, যে গ্রুপটি একাই সরকারের কাছ থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার সুবিধা ভোগ করেছে। শুধু তা-ই নয়, গ্রুপটির বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার অংকে বিদেশে টাকা পাচার করার অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যাপারেই এ পর্যন্ত ওই গ্রুপের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।  

এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক ব্যাংকারসহ অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, ঘটনাবলীতে পরিষ্কার হয়েছে, এমপি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা রাজনৈতিক ক্ষমতার সর্বাত্মক ব্যবহার করছেন। এজন্যই তারা বিত্তশালী হয়ে উঠেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না। কারণ, তারা একদিকে সরকারে রয়েছেন, অন্যদিকে আইনও তারা নিজেরাই প্রণয়ন করছেন। এখানেই শেষ নয়, সাবেক ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদেরা আরো মনে করেন, মূলত ঋণখেলাপি এবং অসৎ ক্ষমতাসীনদের কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলোও খারাপ হয়ে গেছে। সরকারের সমর্থক হওয়ার সুবাদে দুষ্টু ও অযোগ্য কিছু লোককে পরিচালক পদে নিযুক্তি দেয়ায় তারাও যথেচ্ছভাবে ব্যাংকগুলোকে লোপাট করে চলেছেন। কোনো ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সরকার বরং এসব পরিচালকের পাশাপাশি ঋণখেলাপিদেরকেও প্রশ্রয় দিচ্ছে। এজন্যই খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ঋণখেলাপি কোটিপতিদের সংখ্যাও। বড়কথা, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্কিত। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, খেলাপি ঋণের পরিমাণ, ঋণখেলাপি কোটিপতিদের সংখ্যা এবং তাদের দখলে থাকা অর্থের পরিমাণ সম্পর্কিত তথ্য-পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত ভীতিকর। জাতীয় সংসদে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী তার লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছেন বলেই এসব বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করার অবকাশ থাকতে পারে না। বস্তুত এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতির নেতিবাচক দিকটিই প্রাধান্যে এসেছে। শিল্প-কারখানা স্থাপনসহ জাতীয় পুঁজির বিকাশ যেখানে সমৃদ্ধির প্রধান পূর্বশর্ত সেখানে একদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণখেলাপি কোটিপতিদের দখলে চলে গেছে,  অন্যদিকে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে পাল্লা বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। আশংকার বড় একটি কারণ হলো, ঋণখেলাপি কোটিপতিদের খুব স্বল্পসংখ্যকই ঋণের টাকা শিল্প-কারখানা স্থাপনের মতো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করেছেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ বরং তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অলস পড়ে থাকছে। একই সঙ্গে তারা বিদেশেও অর্থ পাচার করছেন। ফলে দেশে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না এবং সবদিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতি।

পরিস্থিতির পর্যালোচনা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, গলদ রয়েছে আসলে ঋণখেলাপি কোটিপতিদের উদ্দেশ্যের মধ্যে। এটা সম্ভব হওয়ার কারণ, খেলাপি ঋণের প্রতিটি ক্ষেত্রে সরাসরি জড়িত রয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। এই নেতারা প্রভাব খাটিয়ে ঋণের ব্যবস্থা যেমন করেন, তেমনি আবার বাঁচিয়ে দেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কবল থেকেও। আর নিজেরাই যেহেতু জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবেও রয়েছেন সেহেতু ঋণের অর্থ না দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছেন খেলাপিরা। মূলত সে কারণেই বেড়ে চলেছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। 

বলা দরকার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের যদি সততা ও সদিচ্ছা থাকতো এবং তারা যদি দূরপ্রসারী গঠনমূলক পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতেন তাহলে অবস্থা অবশ্যই এতটা ভয়াবারহ হতে পারতো না। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা ঘুষ-দুর্নীতির মহোৎসবের পাশাপাশি পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঢালাওভাবে গ্যাসের সংযোগ দেয়া বন্ধ রাখার মতো এমন আরো কিছু পদক্ষেপও নিয়েছেন যেগুলোর কারণে সম্ভাবনাময় অনেক শিল্প-কারখানার পক্ষে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়টিকেও ঋণ পরিশোধ না করার অজুহাত বানানো হয়েছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেমন বেড়েছে তেমনি স্থবির হয়ে পড়েছে জাতীয় অর্থনীতিও। 

আমরা মনে করি, ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হলে তো বটেই, জাতীয় অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের কবল থেকে রক্ষা করতে হলেও সরকারকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য ঘুষ-দুর্নীতির পথ থেকে  অবশ্যই সরে আসতে হবে, একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার দিকেও নজরদারি বাড়াতে হবে। দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দেয়ার পরিবর্তে এমন আয়োজন নিশ্চিত করা দরকার, যাতে শিল্প স্থাপন বা ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে টাউট লোকজন ব্যাংক ঋণ না পেতে পারে এবং যাতে প্রকৃত শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা ঋণের অভাবে বাধাগ্রস্ত না হন। 

ঋণখেলাপি কোটিপতিদের ব্যাপারেও সরকারকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ, এত বিপুল পরিমাণ অর্থ অবশ্যই স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে নেয়া বা জমানো সম্ভব হয়নি। কোটিপতিরা টাকা জমিয়েছেনও বছরের পর বছর ধরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অবৈধ কারবার ছাড়া কোনো গোষ্ঠীর পক্ষেই এত অর্থের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব আসলে হয়ও নি।  সবই সরকারের জানা রয়েছে। এজন্যই এমন ব্যবস্থা নেয়া দরকার, যাতে বিশেষ করে বিগত দশ বছরের কোটিপতিরা তাদের অর্থ শিল্প-কারখানা স্থাপনসহ জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ করতে বাধ্য হন। তারা যাতে অর্থ পাচার করতে না পারেন সে ব্যাপারেও কঠোর নজরদারি থাকা জরুরি।


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018