BdNewsEveryDay.com
Saturday, September 22, 2018

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট কক্ষপথে পৌঁছেছে

Saturday, May 12, 2018 - 838 hours ago

কক্ষপথের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের যাত্রা

সফলভাবে উৎপেণের পর বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ তার নিজস্ব কক্ষপথে পৌঁছেছে।

উৎপেণ শেষে ইতোমধ্যেই রকেট ফ্যালকন ৯, ব্লক ৫ আটলান্টিকের বুকে ভেসে থাকা ড্রোন জাহাজে সফলভাবে অবতরণ করেছে। গতকাল ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের ফোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের ৩৯ এ লঞ্চ প্যাড থেকে এ রকেটটিই বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু-১’কে নিয়ে উঠেছিল। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স সফল উৎপেণের এ খবর নিশ্চিত করে টুইটে বলেছে, ‘স্যাটেলাইটের প্রথম ধাপের পাশাপাশি দ্বিতীয় ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ফ্যালকন-৯ রকেট ইতোমধ্যে ভূপৃষ্ঠে ফিরে এসেছে।’

এ দিকে মহাকাশে পাড়ি দেয়ার পরপর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশন। এ তিন স্টেশন থেকে স্যাটেলাইটটিকে নিয়ন্ত্রণ করে এর নিজস্ব কপথে (১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্লট) স্থাপনের কাজ চলেছে এখন। তবে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ২০ দিন লাগবে। স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের গ্রাউন্ড স্টেশনে হস্তান্তর করা হবে। আর সিগন্যাল পেতে আরও অন্তত ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগতে পারে।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘অরবিটাল স্লট ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রিতে পৌঁছতে স্যাটেলাইটটির ১০-১২ দিন সময় লাগতে পারে। অরবিটাল স্লটে সেট হওয়ার পর তা সিগন্যাল পাঠানো শুরু করবে। এখন আমাদের অপো করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।’

এর আগে সব ধরনের অনিশ্চয়তা আর নানা জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মহাকাশের পথে পাড়ি জমায় বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। গত শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফোরিডার অরল্যান্ডোর কেপ কেনেডি সেন্টারের লঞ্চিং প্যাড থেকে মহাকাশের পথে উড়াল দেয় বঙ্গবন্ধু-১। এর মাধ্যমে ৫৭তম বিশ্ব স্যাটেলাইট কাবের গর্বিত সদস্য হলো বাংলাদেশ।

আর সফলভাবে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ হওয়ায় বাংলাদেশের জনগণ এবং নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতি অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কয়েক দফায় তারিখ বদলানোর পর শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ ব্লক-৫ রকেটে চেপে আকাশে উড়াল দেয় সাড়ে তিন হাজার কেজি ওজনের এই স্যাটেলাইট। উৎপেণের পর নির্ধারিত ৩৩ মিনিটেই স্যাটেলাইটটি কপথে পৌঁছে। রকেট উৎপেণ সংস্থা স্পেসএক্স টুইটারে জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার অরবিটে (জিটিও) স্যাটেলাইটটির অবতরণ নিশ্চিত করেছে। মহাকাশে রাশিয়ার কাছ থেকে বাংলাদেশের ভাড়া নেয়া অরবিটার স্লট ১১৯.১ ডিগ্রিতে নিয়ে যাবে স্যাটেলাইটটিকে।

স্পেসএক্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার (১১ মে) কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯এ থেকে সফলভাবে উৎপেণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট। উৎপেণ শুরু হয় ৪টা ১৪ মিনিটে এবং শেষ হয় ৬টা ২১ মিনিটে। উৎপেণের ৩৩ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড পর স্যাটেলাইটটি জিটিওতে পৌঁছে।

স্পেসএক্সের দেয়া তথ্য অনুসারে, পুরো উৎপেণ প্রক্রিয়াকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম ধাপটি কাউন্ট ডাউন এবং দ্বিতীয় ধাপটি হচ্ছে লঞ্চ, ল্যান্ডিং ও স্যাটেলাইট ডেপলয়মেন্ট। প্রথম ধাপে স্যাটেলাইট উৎপেণ শুরু পর্যন্ত বিভিন্ন পদপে রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপটিতে রয়েছে উৎপেণের পর অবতরণ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া।

সংস্থাটি জানায়, উৎপেণের ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ড পর রকেট ম্যাক্স কিউতে পৌঁছায়। ২ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে প্রথম ধাপে মেইন ইঞ্জিন আলাদা হয়। ২ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে দ্বিতীয় ধাপে ইঞ্জিন চালু হয়।

৩ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে ঘটে ফেয়ারিং ডেপলয়মেন্ট। ৬ মিনিট ১৫ সেকেন্ড পর প্রথম পর্বের এন্ট্রি বার্ন হয়। ৮ মিনিট ১০ সেকেন্ড পর প্রথম পর্বের অবতরণ, ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড পর দ্বিতীয় পর্বের ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন (এসইসিও-১) হয়। ২৭ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে দ্বিতীয় পর্যায়ের ইঞ্জিন চালু হওয়ার পর ২৮ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে দ্বিতীয় ধাপে ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন (এসইসিও-২) হয়। এরপর ৩৩ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে স্যাটেলাইটটি অরবিটে বা কপথে অবতরণ করে।

১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রির অরবিটাল স্লটে (নিররেখায়) উড়বে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। বঙ্গবন্ধু-১ উৎপেণের জন্য ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে ১৫ বছরের জন্য অরবিটাল স্লট বা নিররেখা (১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি) লিজ নিয়েছে বাংলাদেশ। ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ে এ স্লট বরাদ্দ নেয়া হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব স্পেস কমিউনিকেশনের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। ১৫ বছরের চুক্তিটি করা হলেও তিন ধাপে তা ৪৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। এই প্রকল্পে সরকারের যে টাকা খরচ হবে তা স্যাটেলাইট ভাড়া দিয়ে আট বছরে তুলে এনে এই প্রকল্পকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, স্যাটেলাইটটির মাধ্যমে বছরে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার সাশ্রয় হবে বাংলাদেশের। নিজস্ব স্যাটেলাইট না থাকায় এখন অন্য দেশের স্যাটেলাইট ভাড়া করে প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছিল বাংলাদেশকে। অন্য দিকে দেশের স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো বিভিন্ন দেশের স্যাটেলাইট ভাড়া করে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে আসছে। নিজস্ব স্যাটেলাইট হলে ভাড়ার টাকা আর বিদেশে পাঠাতে হবে না। ওই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ডলার। এই পরিমাণ অর্থ সরকার প্রতি বছর রাজস্ব হিসেবে আয় করতে পারবে।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটে ২৬টি ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার ও ১৪টি সি-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি বাংলাদেশ ব্যবহার করবে এবং বাকি ২০টি ভাড়া দেয়া হবে। এটি সক্রিয় হলে দেশের টেলিভিশন ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট যোগাযোগে উন্নতি ঘটবে। এ স্যাটেলাইটের কারণে তিন ধরনের সেবা ও ৪০ ধরনের সুফল পাবে দেশবাসী।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি নির্মাণ করেছে ফ্রান্সের থ্যালাস অ্যালেনিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান। স্যাটেলাইটের কাঠামো তৈরি, উৎপেণ, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দু’টি স্টেশন পরিচালনার দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানটির। প্রথম তিন বছর তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে স্যাটেলাইটটি। পরে বাংলাদেশীদের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা।

শুক্রবার রাতে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎপেণ হলেও প্রথমে ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর তা উৎপেণের পরিকল্পনা করা হয়। পরে নতুন তারিখ ঠিক হয় এ বছরের ১ মার্চ। আবারো পরিবর্তন হয় সম্ভাব্য তারিখ। নতুন তারিখ ধরা হয় মার্চের শেষ সপ্তাহ বা ২৬-৩১ মার্চের মধ্যে যেকোনো দিন।

কিন্তু এ সময়ের মধ্যেও মহাকাশে ওড়েনি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। বেশ কয়েকবার তারিখ নির্ধারণের পরও স্যাটেলাইটটি উৎপেণ করতে দেরি হচ্ছিল। সর্বশেষ গত ১০ মে বৃহস্পতিবার রাতে স্যাটেলাইটটি উৎপেণের সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আটকে যায় উৎপেণ। কারিগরি জটিলতায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে জানিয়েছিল মার্কিন বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স।

 


bdnewseveryday.com © 2017 - 2018